ফরাসি সাহিত্যের একটা তাৎপর্যময় গল্প হলো Mouton de Panurge। দু মিনিট সময় নিয়ে গল্পটি পড়লে আশাকরি আমাদের চিন্তা কিছুটা শানিত হবে।
ফরাসী ভদ্রলোক পানোর্জ নদী পার হতে নৌকার যাত্রী হয় । নদীটা বেশ স্রোতস্বীনি। একই নৌকায় যাত্রী হিসাবে ওঠে ডেনডুনো নামক এক মেষ ব্যবসায়ী। তার সাথে অসংখ্য মেষ। ডেনডুনো খুবই মুনাফা আর অর্থলোভী ব্যবসায়ী। মানবতাবোধ , মহত্ত্ব ইত্যাদি থেকে সে যোজন যোজন দূরে। তার জীবনের সমস্ত কিছু শুধু অর্থ আর মুনাফা দিয়ে ঠাসা।
নৌকাটি যখন নদীর মাঝপথে ঠিক এমন সময় পানোর্জ এবং ডেনডুনোর মধ্যে বেশ বাকবিতন্ডা হয়। পানোর্জ প্রতিজ্ঞা করে সে মুনাফালোভী ডেনডুনোকে আজ একটা কঠিন শিক্ষা দিবে।
পানোর্জ ডেনডুনোর কাছ থেকে বড় একটা মেষ বেশ উচ্চমূল্যে কিনে নেয়। মেষটিকে দেখেই মনে হচ্ছিলো এই মেষটিই মেষদলের দলপতি। অধিক মুনাফা পেয়ে ডেনডুনো খুবই খুশি।
এরপর ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা।
পানোর্জ মেষটির শিং ধরে শক্তভাবে টেনে নৌকার এক প্রান্তে নিয়ে যায় এবং মাঝ নদীতে ফেলে দেয়। দলপতি মেষকে অনুসরণ করতে গিয়ে অন্যান্য মেষগুলোও একের পর এক নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ডেনডুনো এটা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা। ঘটনার আকস্মিকতায় সে পুরোই হতভম্ব হয়ে যায়।
সে নৌকায় এদিক ওদিক ছুটোছুটি করতে থাকে। একটাকে রক্ষা করতে গেলে আরেকটা নদীতে ঝাঁপ দেয়। ডেনডুনো চেষ্টা করে অন্ততঃ একটা মেষকে রক্ষা করতে। শেষ মেষটি যখন নদীতে ঝাঁপ দিতে যায় । সেটাকে ধরার জন্য সে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে এবং একেবারে উন্মাদের মতো সে নিজেও পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
এই গল্প থেকেই "পানোর্জের মেষ বা Mouton de Panurge শব্দগুচ্ছ ফরাসি ভাষায় পরিচিতি লাভ করে। যার মানে হলো যখন কোনো জনগোষ্ঠি একেবারে অন্ধ কিংবা দাসের মতো কোনো কিছু অনুসরণ করে। আমরা প্রায়ই আমাদের জীবনে "পানোর্জেরনোর্জের মেষ" এর মত অন্ধভক্তদের দেখি। যারা শুধুমাত্র অন্যদের দেখে বা শোনে এবং নিজের চিন্তাকে শানিত না করে অন্ধ অনুকরণ করে।
পশু আর মানুষের মাঝে পার্থক্য হলো মানুষের বুদ্ধি আর চিন্তার স্বাধীনতা। মানুষের স্বকীয় চিন্তার স্বাধীনতা যখন বিনাশ হয়ে যায় তখন সে অন্ধ দাসে পরিণত হয়। তখন সে নিজেও বুঝতে পারেনা- সে যা করছে তা সে অন্যের উদ্দ্যেশ্য এবং লক্ষ পূরণের জন্যই করে যাচ্ছে।
মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে চিন্তার মেষ হওয়া থেকে রক্ষা করুন।
এক দেশে ছিল দুই নারী—একজনের নাম প্রজ্ঞা, আরেকজনের নাম অহংকার। দু’জনেই একই রকম সংসারে পা রেখেছিল। একই রকম উঠোন, একই রকম মানুষের ভিড়, একই রকম হাসি-কান্না। কিন্তু সময়ের সাথে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেল। প্রজ্ঞা বুঝেছিল, সংসার আসলে একটা রাজ্য। এ রাজ্যের রাজা শুধু একজন মানুষ নয়—এখানে শ্বশুরের সম্মান, শাশুড়ির মুখের হাসি, স্বামীর পরিশ্রম, ভাইবোনের সম্পর্ক—সব মিলেই রাজ্যের ভিত্তি। তাই সে নিজের হাতে সংসারের ভাঙা দেয়ালে রঙ করেছে, ক্লান্ত মানুষদের কপালে স্নেহের জল ছুঁইয়ে দিয়েছে, স্বামীর ছোট সাফল্যকেও মানুষের সামনে গর্ব করে বলেছে। লোকেরা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল— “কি সুন্দর পরিবার!” “কি ভদ্র ছেলে!” “কি সম্মানিত মানুষ!” আর সেই প্রশংসার আলো যখন পুরো পরিবারকে আলোকিত করল, তখন অজান্তেই প্রজ্ঞার মাথাতেও মুকুট উঠে এলো। কারণ মানুষ জানে— যে নারী একটি পরিবারকে সম্মানের আসনে বসাতে পারে, সে নিজেও সম্মানের যোগ্য। রাজ্য বড় হলে রানীর মর্যাদাও বড় হয়। অন্যদিকে অহংকার প্রতিদিন নিজের ঘরের মানুষদের ছোট করত। স্বামীর ব্যর্থতা নিয়ে মানুষের সামনে হাসত, শ্বশুরবাড়ির দোষ গল্পের মতো ছড়িয়ে বেড়াত, সম্পর্কের ক্ষতগুলোকে আড়াল না করে...

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন