এ লোককে আমি চিনি। বাসে একা বসে আছেন। তাও আবার একা সিটে। একদম দরজার পাশে হেল্পারের জন্য যে সিটটা থাকে- সেখানে ভদ্রলোকের এক ছেলে হারিয়ে গেছে। তারপর থেকে মাথায় গোলমাল। প্রায়ই আমার কাছে আসেন, একগাদা ঔষধ লিখিয়ে নিয়ে যান। এ বাস কখন ছাড়বে স্বয়ং ঈশ্বরও বুঝি জানে না। ঢিমেতালে সব সিট ভরাট হবে, তারপর ঠেসে উঠাবে লোকজন। তিনি চাইলেই পাঁচ টাকা বেশি ভাড়া দিয়ে এর চেয়ে ভাল বাসে চড়তে পারেন। পৌঁছাবেন অনেক আগে। আসলে গিয়ে কী করবেন। এমন কোনো রাজ্যের কাজ নেই যে তার জন্য পড়ে আছে। এর চেয়ে এ ভাল। বাসযাত্রীও এক পরিচয়।আজ উনাকে দেখে মায়া লাগছে। এতদিন বিরক্ত হতাম। আমি দেখেছি সহানুভূতি যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন- তারা সহানুভূতি চায়না। যারা চায় তাদের অতটা না হলেও চলে। মারা যাবে এমন রোগী কখনো বাঁচার আকুতি নিয়ে কান্না করে না। মনে পড়লো ভদ্রলোক এখন এসে আর ছেলে হারানোর কথা বলেন না। বলেন যে 'ঘুম হয়না', 'শরীর কাঁপে'। তিনি কারনকে সরিয়ে দিচ্ছেন। তার কাছে পৌঁছানোর সেতু ধ্বংস করে দিচ্ছেন।পুরো ফাঁকা বাসে একা সিটে বসা, একের পর এক সহযাত্রী উঠবে- কারো মুখের দিকে না চাওয়া- নিঃসঙ্গ একাকীত্বের সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
এ ঘন বাসস্ট্যান্ডে এতো মানুষের ভীড়েও কী কুৎসিত একা থাকা। এগুলো ঠিক দেখা যায়না, কান পাতলে শোনা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন 'আমাকে যদি শ্রুতি আর দৃষ্টি দুটোর কোনো একটা হারানোর হতো- আমি দৃষ্টি হারাতে রাজি হতাম শ্রুতি নয়।' তিনি কেন দৃষ্টি হারাতে চেয়েছিলেন এখন বুঝতে পারি। অনেককিছু দেখতে একিরকম হতে পারে, মুখের ভাষা কখনো এক হবেনা।'আমি ভাল নেই' বলতে সবাই পারেনা। বলার মতো লোকও পায়না। কাকে বলবে? যে শুনবে সে জিজ্ঞেস করবে- কেন। কেন'র কারন শুনে একে সাধারণ দুঃখের মতো রেখে দিবে। একে সাধারণের সাথে রাখার চেয়ে নিজের কাছে রাখা ভাল। যতই ভারী হোক আর নিজেকে মাটির নিচে গেঁথে ফেলুক!আজ হাসপাতাল যাইনি। এখন কোথায় যাচ্ছি তাও জানিনা। সামনের যাত্রী বলছে- 'আজ একদম অসহ্য গরম'। আমার গরম ঠান্ডা কিছু লাগছেনা। মনে হচ্ছে যারা অত্যন্ত সুখী মানুষ তারাই আবহাওয়া নিয়ে থাকে। আকাশ, মেঘ, বৃষ্টি, চাঁদ- সব সুখীদের জন্য। পত্রিকা ফেসবুক তর্ক সব তাদের জন্য।কাকতালীয় ভাবে আজ ১৯ এপ্রিল। ঠাকুরবাড়ির কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যার দিন। সবাই কী আর জমিয়ে রাখতে পারে কাঁপড়ের ভাঁজে হাতির দাঁতে বানানো আফিমের কৌটো? অভিমান সবারই হয়। স্পর্শের অনন্ত প্রতীক্ষা নিয়ে জাহাজগুলো বন্দর ছেড়ে যায়।
এক দেশে ছিল দুই নারী—একজনের নাম প্রজ্ঞা, আরেকজনের নাম অহংকার। দু’জনেই একই রকম সংসারে পা রেখেছিল। একই রকম উঠোন, একই রকম মানুষের ভিড়, একই রকম হাসি-কান্না। কিন্তু সময়ের সাথে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেল। প্রজ্ঞা বুঝেছিল, সংসার আসলে একটা রাজ্য। এ রাজ্যের রাজা শুধু একজন মানুষ নয়—এখানে শ্বশুরের সম্মান, শাশুড়ির মুখের হাসি, স্বামীর পরিশ্রম, ভাইবোনের সম্পর্ক—সব মিলেই রাজ্যের ভিত্তি। তাই সে নিজের হাতে সংসারের ভাঙা দেয়ালে রঙ করেছে, ক্লান্ত মানুষদের কপালে স্নেহের জল ছুঁইয়ে দিয়েছে, স্বামীর ছোট সাফল্যকেও মানুষের সামনে গর্ব করে বলেছে। লোকেরা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল— “কি সুন্দর পরিবার!” “কি ভদ্র ছেলে!” “কি সম্মানিত মানুষ!” আর সেই প্রশংসার আলো যখন পুরো পরিবারকে আলোকিত করল, তখন অজান্তেই প্রজ্ঞার মাথাতেও মুকুট উঠে এলো। কারণ মানুষ জানে— যে নারী একটি পরিবারকে সম্মানের আসনে বসাতে পারে, সে নিজেও সম্মানের যোগ্য। রাজ্য বড় হলে রানীর মর্যাদাও বড় হয়। অন্যদিকে অহংকার প্রতিদিন নিজের ঘরের মানুষদের ছোট করত। স্বামীর ব্যর্থতা নিয়ে মানুষের সামনে হাসত, শ্বশুরবাড়ির দোষ গল্পের মতো ছড়িয়ে বেড়াত, সম্পর্কের ক্ষতগুলোকে আড়াল না করে...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন