বিশ শতকের শুরুতে নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং আতরাফ বা নিম্নবর্গের মুসলমানের মধ্যে হৃদ্যতা যতখানি ছিলো, শত্রুতা ছিলোনা তার সিকিভাগও। আবার দেখছি ঢাকার নবাব পরিবারের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ পাচ্ছেন ঢাকা ও আশেপাশের হিন্দু জমিদারগণ। মিলটা লক্ষ্য করার মতো। উচুঁ তলার হিন্দুর সাথে উঁচু তলার মুসলমানের সখ্য। আবার নিম্নবর্গের মুসলমানের সাথে নিম্নবর্গের হিন্দুর সখ্য।
ধর্ম এখানে অপ্রাসঙ্গিক। এখানে মিলনের সূত্র শ্রেণী। সাথে হয়তো বর্ণ। উভয়েই নিম্ন বর্ণ বা বর্গের ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে নিম্ন শ্রেণীর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাথে সাথেই হিন্দু ছাত্রদের জন্য নির্মিত হয় জগন্নাথ হল। এই হলে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের থাকা ও খাবার জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এই নিম্নবর্ণের হিন্দু ছাত্রদের সাথে সখ্য ছিল না উচ্চ বর্ণের হিন্দুর।
এখানে বিভেদের কারণ মূলত বর্ণগত। (বর্ণের সাথে শ্রেণীরও হতে পারে। কারন ভারতে উচ্চ বর্ণই প্রধানত উচ্চ শ্রেণী তৈরী করেছে। তবে নিম্ন বর্ণের কোন হিন্দুর অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উচ্চ শ্রেণীতে উত্তরণ ঘটলে বর্ণ হিন্দু তাকে কিভাবে দেখতো সে বিষয়ে আমার এখনো পর্যন্ত কোন পড়াশোনা নেই।)
ঢাকা হলের মুসলিম ছাত্রদের সাথে জগন্নাথ হলের নিম্ন বর্ণের হিন্দু ছাত্রদের বন্ধুত্ব হত। ধর্ম এখানে বিভাজন করতে পারেনি। এখানে ঐক্য বর্ণের ও শ্রেণীর।
আমরা শুনি জমিদারী আমলে পূ্র্ববঙ্গে হিন্দু জমিদারদের হাতে নিগৃহীত হতো মুসলমান প্রজা। কথাটা সত্য। কিন্তুু সত্যটা সম্পূর্ণ ঘটনাটার অর্ধেক। পূর্ববঙ্গের সকল হিন্দুই কি জমিদার ছিলো?কোন হিন্দু প্রজা ছিলোনা?ছিলো এবং হিন্দু জমিদারের হাতে মুসলমান প্রজার সাথে একই ভাগ্য বরণ করতে হতো হিন্দু প্রজাদেরকেও। হিন্দুদের জন্য আলাদা কোন ব্যবস্থা ছিলো এমন কোন প্রমাণ কেউ জানলে আমাকে জানাবেন প্লিজ।
এখানে দ্বন্দটা শ্রেণীর। সামন্তপ্রভু বনাম প্রজা। ধর্ম ও বর্ণ এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু এখানেই ঘটেছে বড় গণ্ডগোল। অধিকাংশ জমিদার হিন্দু হওয়ায় আর পূর্ববঙ্গে মুসলমানের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় শ্রেণী সমস্যাকে ইচ্ছাকৃতভাবে সাম্প্রদায়িক সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পূর্ববঙ্গে ধর্মীয় বিভাজনের চাইতে বেশী ক্রিয়াশীল ছিলো শ্রেণী দ্বন্দ। শ্রেণী দ্বন্দকে মুসলিম রাজনীতি সাম্প্রদায়িক দ্বন্দরূপে মানুষের সামনে উপস্থাপন করে মানুষের মনে আগে সাম্প্রদায়িক বীজ বোপন করেছে। তারপর সাম্প্রদায়িক লাইনে ভারতভাগ ও দেশভাগ হওয়াটা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
দেশভাগের সময় উচ্চবর্ণের হিন্দু যারা শ্রেণীর দিক দিয়েও উচ্চশ্রেণীর তারা অনেকেই চলে গেছে পশ্চিমবঙ্গে।
এদেশে থেকে গেছে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা। এরা থেকে গেছে কারণ প্রতিবেশী নিম্মবর্ণের মুসলমানের সাথে এদের দৈনন্দিন যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা প্রায় অভিন্ন। উঁচু বর্ণের হিন্দু ও মুসলমান উভয় কর্তৃক এরা পরিত্যজ্য,অচ্ছুত। এই অভিজ্ঞতা নিম্ন বর্ণের হিন্দু ও মুসলমানকে এক সূত্রে গ্রন্থিত করে রেখেছিল। শ্রেণীগত দিক দিয়ে তারা এক। যোগেন মণ্ডলের মুসলিম লীগ ও পাকিস্থান সমর্থন মূলত তফসিলী হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে শ্রেণীগত ঐক্যের কারণেই। দলিত বা তফসিলী সম্প্রদায়ের লোকেরা হিন্দুু হলেও বর্ণ হিন্দুরা এদেরকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতেই দেখতো। ধর্ম এখানে এক হলেও ধর্মগত বর্ণ এখানে বিভাজক।
কিন্তু যোগেন মণ্ডল পাকিস্তানের মন্ত্রী হতে পারলেও শেষ পর্যন্ত তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। যে ঐক্য তিনি দেখতে পেয়েছিলেন তফসিলী হিন্দু ও গরীব মুসলমানদের মধ্যে সে ঐক্য আর থাকেনি পরবর্তীতে। সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিতে দীক্ষিত হওয়ার পর সেই গ্রন্থি ক্রমেই শিথিল হয়েছে। যোগেন মণ্ডলকে পশ্চিমবঙ্গে চলে যেতে হয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গে তিনি প্রথমে যেতে চাননি বর্ণহিন্দুদের শোষণের ভয়ে। শ্রেণীগত ঐক্য শেষ বিচারে পরাজিত হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার কাছে।
তবুও যেটা শ্রেণীর সমস্যা সেটাকে শ্রেণীর সমস্যা,যেটা বর্ণের সমস্যা সেটাকে বর্ণের সমস্যা এবং যেটা ধর্মীয় সম্প্রদায়িকতার সমস্যা সেটা সাম্প্রদায়িক সমস্যা হিসেবেই ব্যাখ্যা করতে হবে। সাম্প্রদায়িকতা শেষ হাসিটা হেসেছে বলে সব সমস্যাকে সাম্প্রদায়িক সমস্যা আকারে দেখাটা সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভুল ও অসততার পরিচায়ক।
এক দেশে ছিল দুই নারী—একজনের নাম প্রজ্ঞা, আরেকজনের নাম অহংকার। দু’জনেই একই রকম সংসারে পা রেখেছিল। একই রকম উঠোন, একই রকম মানুষের ভিড়, একই রকম হাসি-কান্না। কিন্তু সময়ের সাথে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেল। প্রজ্ঞা বুঝেছিল, সংসার আসলে একটা রাজ্য। এ রাজ্যের রাজা শুধু একজন মানুষ নয়—এখানে শ্বশুরের সম্মান, শাশুড়ির মুখের হাসি, স্বামীর পরিশ্রম, ভাইবোনের সম্পর্ক—সব মিলেই রাজ্যের ভিত্তি। তাই সে নিজের হাতে সংসারের ভাঙা দেয়ালে রঙ করেছে, ক্লান্ত মানুষদের কপালে স্নেহের জল ছুঁইয়ে দিয়েছে, স্বামীর ছোট সাফল্যকেও মানুষের সামনে গর্ব করে বলেছে। লোকেরা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল— “কি সুন্দর পরিবার!” “কি ভদ্র ছেলে!” “কি সম্মানিত মানুষ!” আর সেই প্রশংসার আলো যখন পুরো পরিবারকে আলোকিত করল, তখন অজান্তেই প্রজ্ঞার মাথাতেও মুকুট উঠে এলো। কারণ মানুষ জানে— যে নারী একটি পরিবারকে সম্মানের আসনে বসাতে পারে, সে নিজেও সম্মানের যোগ্য। রাজ্য বড় হলে রানীর মর্যাদাও বড় হয়। অন্যদিকে অহংকার প্রতিদিন নিজের ঘরের মানুষদের ছোট করত। স্বামীর ব্যর্থতা নিয়ে মানুষের সামনে হাসত, শ্বশুরবাড়ির দোষ গল্পের মতো ছড়িয়ে বেড়াত, সম্পর্কের ক্ষতগুলোকে আড়াল না করে...

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন