**************************************
ইশতেহার **************************************
পৃথিবীতে মানুষ তখনও ব্যক্তিস্বার্থে ভাগ হয়ে যায়নি । ভুমির কোনো মালিকানা হয়নি তখনো । তখনো মানুষ শুধু পৃথিবীর সন্তান । অরন্য আর মরুভূমির সমুদ্র আর পাহাড়ের ভাষা তখন আমরা জানি । আমরা ভূমিকে কর্ষন করে শস্য জন্মাতে শিখেছি । আমরা বিশল্যকরনীর চিকিৎসা জানি আমরা শীত আর উত্তাপে সহনশীল ত্বক তৈরি করেছি আমাদের শরীরের । আমরা তখন সোমরস, নৃত্য আর শরীরের পবিত্র উৎসব শিখেছি । আমাদের নারীরা জমিনে শস্য ফলায় আর আমাদের পুরুষেরা শিকার করে ঘাই হরিন। আমরা সবাই মিলে খাই আর পান করি । জ্বলন্ত আগুনকে ঘিরে সবাই আমরা নাচি আর প্রশংসা করি পৃথিবীর । আমরা আমাদের বিস্ময় আর সুন্দরগুলোকে বন্দনা করি । পৃথিবীর পূর্নিমা রাতের ঝলোমলো জ্যোৎস্নায় পৃথিবীর নারী আর পুরুষেরা পাহাড়ের সবুজ অরন্যে এসে শরীরের উৎসব করে । তখন কী আনন্দরঞ্জিত আমাদের বিশ্বাস । তখন কী শ্রমমুখর আমাদের দিনমান । তখন কী গৌরবময় আমাদের মৃত্যু । তারপর – কৌমজীবন ভেঙে আমরা গড়লাম সামন্ত সমাজ । বন্যপ্রানীর বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্রগুলো আমরা ব্যবহার করলাম আমাদের নিজের বিরুদ্ধে । আমাদের কেউ কেউ শ্রমহীনতায় প্রশান্তি খুঁজে পেতে চাইলো । দুর্বল মানুষেরা হয়ে উঠলো আমাদের সেবার সামগ্রী । আমাদের কারো কারো তর্জনী জীবন ও মৃত্যুর নির্ধারন হলো । ভারী জিনিস টানার জন্যে আমরা যে চাকা তৈরি করেছিলাম তাকে ব্যবহার করলাম আমাদের পায়ের পেশীর আরামের জন্যে । আমাদের বন্য অস্ত্র সভ্যতার নামে গ্রাস করে চললো মানুষের জীবন ও জনপদ । আমরা আমাদের চোখকে সুদূরপ্রসারী করার জন্যে দূরবীন আর সূক্ষ্ নিরীক্ষনের জন্যে অনুবীক্ষন তৈরি করলাম । আমাদের পায়ের গতি বর্ধন করলো উড়ন্ত বিমান । আমাদের কন্ঠস্বর বর্ধিত হলো, আমাদের ভাষা ও বক্তব্য গ্রন্থিত হলো, আমরা রচনা করলাম আমাদের অগ্রযাত্রার ইতিহাস । আমাদের মস্তিষ্ককে আরো নিখুঁত ও ব্যপক করার জন্যে আমরা তৈরি করলাম কম্পিউটার । আমাদের নির্মিত যন্ত্র শৃঙ্খলিত করলো আমাদের আমাদের নির্মিত নগর আবদ্ধ করলো আমাদের আমাদের পুঁজি ও ক্ষমতা অবরুদ্ধ করলো আমাদের আমাদের নভোযান উৎকেন্দ্রিক করলো আমাদের । অস্তিত্ব রক্ষার নামে আমরা তৈরী করলাম মারনাস্ত্র । জীবনরক্ষার নামে আমরা তৈরি করলাম জীবনবিনাশী হাতিয়ার । আমরা তৈরি করলাম পৃথিবী নির্মূল-সক্ষম পারমানবিক বোমা । একটার পর একটা খাঁচা নির্মান করেছি আমরা । আবার সে খাঁচা ভেঙে নতুন খাঁচা বানিয়েছি – খাঁচার পর খাঁচায় আটকে পড়তে পড়তে খাঁচার আঘাতে ভাঙতে ভাঙতে, টুকরো টুকরো হয়ে আজ আমরা একা হয়ে গেছি । প্রত্যেকে একা হয়ে গেছি । কী ভয়ংকর এই একাকীত্ব ! কী নির্মম এই বান্ধবহীনতা ! কী বেদনাময় এই বিশ্বাসহীনতা ! এই সৌরমন্ডলের এই পৃথিবীর এক কপতাখ্য নদীর পাড়ে যে-শিশুর জন্ম । দিগন্তবিস্তৃত মাঠে ছুটে বেড়ানোর অদম্য স্বপ্ন যে-কিশোরের । জ্যোৎস্না যাকে প্লাবিত করে । বনভূমি যাকে দুর্বিনীত করে । নদীর জোয়াড় যাকে ডাকে নেশার ডাকের মতো । অথচ যার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে ঔপনিবেশিক জোয়াল গোলাম বানানোর শিক্ষাযন্ত্র । অথচ যার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এক হৃদয়হীন ধর্মের আচার । অথচ যাকে শৃঙ্খলিত করা হয়েছে স্বপ্নহীন সংস্কারে । যে-তরুন উনসত্তরের অন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে যে-তরুন অস্ত্র হাতে স্বাধীনতাযুদ্ধে গিয়েছে যে-তরুনের বিশ্বাস, স্বপ্ন, সাধ, স্বাধীনতা-উত্তরকালে ভেঙে খান খান হয়েছে, অন্তবে রক্তাক্ত যে-তরুন নিরুপায় দেখেছে নৈরাজ্য, প্রতারনা আর নির্মমতাকে । দুর্ভিক্ষ আর দুঃশাসন যার নির্ভৃত বাসনাগুলো দুমড়ে মুচড়ে তছনছ করেছে যে-যুবক দেখেছে এক অদৃশ্য হাতের খেলা দেখেছে অদৃশ্য এক কালোহাত যে-যুবক মিছিলে নেমেছে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছে আকন্ঠ মদের নেশায় চুর চুর হয়ে থেকেছে অনাহারে উড়নচন্ডী ঘুরছে যে-যুবক ভয়ানক অনিশ্চয়তা আর বাজির মুখে ছুঁড়ে দিয়েছে নিজেকে যে-পুরুষ এক শ্যমল নারীর সাথে জীবন বিনিময় করেছে যে-পুরুষ ক্ষুধা, মৃত্যু আর বেদনার সাথে লড়ছে এখনো, লড়ছে বৈষম্য আর শ্রেনীর বিরুদ্ধে – সে আমি । আমি একা । এই ব্রক্ষ্মান্ডের ভিতর একটি বিন্দুর মতো আমি একা । আমার অন্তর রক্তাক্ত । আমার মস্তিষ্ক জর্জরিত । আমার স্বপ্ন নিয়ন্ত্রিত । আমার শবীর লাবন্যহীন । আমার জীভ কাটা । তবু এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন আমাকে কাতর করে আমাকে তড়ায়... আমাদের কৃষকেরা শূন্য পাকস্থলি আর বুকের ক্ষয়কাশ নিয়ে মাঠে যায় । আমাদের নারীরা ক্ষুধায় পীড়িত, হাড্ডিসার । আমাদের শ্রমিকেরা স্বাস্থহীন । আমাদের শিশুরা অপুষ্ট, বীভৎস-করুন । আমাদের অধিকাংশ মানুষ ক্ষুধা, অকালমৃত্যু আর দীর্ঘশ্বাসের সমুদ্রে ডুবে আছে । পৃথিবীর যুদ্ধবাজ লোকদের জটিল পরিচালনায় ষড়যন্ত্রে আর নির্মমতায়, আমরা এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তা আর চরম অসহায়ত্বের আবর্তে আটকে পড়েছি । কী বেদনাময় এই অনিশ্চয়তা ! আর চরম অসহায়ত্বের আবর্তে আটকা পড়েছি । কী বেদনাময় এই অনিশ্চয়তা ! কী বিভৎস এই ভালোবাসাহীনতা ! কী নির্মম এই সবকিছু,,,,,,,,,,,,,,,,,,
এক দেশে ছিল দুই নারী—একজনের নাম প্রজ্ঞা, আরেকজনের নাম অহংকার। দু’জনেই একই রকম সংসারে পা রেখেছিল। একই রকম উঠোন, একই রকম মানুষের ভিড়, একই রকম হাসি-কান্না। কিন্তু সময়ের সাথে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেল। প্রজ্ঞা বুঝেছিল, সংসার আসলে একটা রাজ্য। এ রাজ্যের রাজা শুধু একজন মানুষ নয়—এখানে শ্বশুরের সম্মান, শাশুড়ির মুখের হাসি, স্বামীর পরিশ্রম, ভাইবোনের সম্পর্ক—সব মিলেই রাজ্যের ভিত্তি। তাই সে নিজের হাতে সংসারের ভাঙা দেয়ালে রঙ করেছে, ক্লান্ত মানুষদের কপালে স্নেহের জল ছুঁইয়ে দিয়েছে, স্বামীর ছোট সাফল্যকেও মানুষের সামনে গর্ব করে বলেছে। লোকেরা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল— “কি সুন্দর পরিবার!” “কি ভদ্র ছেলে!” “কি সম্মানিত মানুষ!” আর সেই প্রশংসার আলো যখন পুরো পরিবারকে আলোকিত করল, তখন অজান্তেই প্রজ্ঞার মাথাতেও মুকুট উঠে এলো। কারণ মানুষ জানে— যে নারী একটি পরিবারকে সম্মানের আসনে বসাতে পারে, সে নিজেও সম্মানের যোগ্য। রাজ্য বড় হলে রানীর মর্যাদাও বড় হয়। অন্যদিকে অহংকার প্রতিদিন নিজের ঘরের মানুষদের ছোট করত। স্বামীর ব্যর্থতা নিয়ে মানুষের সামনে হাসত, শ্বশুরবাড়ির দোষ গল্পের মতো ছড়িয়ে বেড়াত, সম্পর্কের ক্ষতগুলোকে আড়াল না করে...

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন