সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আত্মপ্রবঞ্চক না কি অবিমৃষ্যকারী?

আমার শৈশব কৈশোর কেটেছে মফস্বলে। একটা গাঙের খুব কাছে ছিল আমাদের বাড়ি। ওই গাঙের সাথেই আমাদের শৈশব-কৈশোরের অনেক স্মৃতি বাঁধা। সেখানে স্নান করতাম, মাছ ধরতাম, জলেই চলতো নানান খেলা। কিন্তু সেই সব সুখের সাথে মিশে ছিল মনুষ্য বিষ্ঠাও। নদীর পাড় ধরে নানান জায়গায় মানুষ মল ত্যাগ করতো। অনেকের বাসার পায়খানা ছিল নদীর পাড়ে। মল সরাসরি নদীতে পড়তো। এই নদীর ঘাটেই দেখতাম মেয়েরা বাচ্চা-বুড়োদের মলমাখা কাপড় ধুতো। মরা গরু-মহিষ-ছাগল ভেসে যেতেও দেখতাম প্রায়শই। ভোরে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নৌকার গোলুইতে বসে প্রাকৃতিক কর্ম সারতে দেখেছি জেলে-মাঝিদের। এই নদীর জলেই মানুষ স্নানাদি সারতো। হিন্দু নারী-পুরুষকে এই নদীর জলে দাঁড়িয়েই স্নানান্তে সূর্যপ্রণাম করতেও দেখতাম। অনেক নারী এই নদী থেকেই কলসি করে জল তুলে নিয়ে বাসায় ফিরে যেত। অনেককে কয়লা দিয়ে দাঁত মেজে ওই পানিতেই কুলকুচি করতে দেখেছি। আমাদের বাসার কাছে একটা পুকুর ছিল। সেই পুকুরের ছিল সানবাঁধানো দুটা ঘাট। ওটিতে স্নান করতে গিয়েও দেখতাম মেয়েরা বাসার থালাবাসন যেমন ধুচ্ছে, তেমনি বাসার কাপড়চোপড় ইত্যাদিও ধুচ্ছে। এই পুকুরেও গরু-ছাগল ধোয়াইতেও দেখেছি। এমনও দেখেছি বহুবার, ভাসতে ভাসতে কাছে চলে আসা মনুষ্যবিষ্ঠা পানিতে ঢেউ তুলে দূরে সরিয়ে দিয়ে স্নান সেরে নিচ্ছে মানুষ। জলে নেমে নিজে থুতু ফেলে সেই থুতু জলে ধাক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে ঝপ ঝপ ডুব দিয়ে চলেছে। নদী-পুকুরে নামলে আমার একটা অস্বস্তি হতো। আম্মা খুব অপছন্দ করতো নদীপুকুরে স্নান করা। সেখান থেকে স্নান করে এলেও বাসায় এসে আবার কলের পানিতে গা-ধুয়ে নিতে হতো। আম্মা প্রায়ই নদীর পানি থেকে রোগ বালাইয়ের কথাও বলতেন। তার মানে, অনেকেই ভালভাবে জানতো যে পুকুর-নদীর পানি স্নান-গোসলের জন্য নিরাপদ না। তারপরও শত শত মানুষ ওই রকম নদী-পুকুরের অমন পানিতে স্নান-গোসল করতো। এইটা কীভাবে সম্ভব হতো বা হয়? নদীর পাড়ে যারা পায়খানা বসাতো, যারা নদীর পাড়ে হাগুমুতু করতো, যারা কাপড়ে মাখা বিষ্ঠা ধুতো তারাই আবার নদীতে স্নান করতো, নদীর জল মুখে নিয়ে কুলকুচি করত, কলসিতে জল ভরে নিত। ওরা কী বুঝতেন না যে এই জলে কিছু একটা ঝামেলা বা অশূচ রয়ে যাচ্ছে? তারা বুঝতেন, কিন্তু বুঝটা ছিল সংকীর্ণ- নিজের সামনের অংশের পানিটুকু পরিষ্কার থাকলেই তারা মনে করতে চাইতেন যে তার পানি পবিত্র। সম্ভবত এ কারণেই হাত দিয়ে জলে ভাসা বিষ্টা দূরে সরিয়ে নিজের কাজটুকু সেরে নিতে তাদের কোনো অসুবিধা হতো না! এখন কি এই দৃশ্য হারিয়ে গেছে? সম্ভবত যায়নি। তবে একদিকে জলের বৈশিষ্ট্য বা চরিত্র সম্পর্কে কিছু জানাশোনা হওয়ায় আর অন্যদিকে টিউবওয়েল বা পানি সাপ্লাই ব্যবস্থার প্রসার হওয়ায় মানুষের শূচিতার ধারণায় ও আচরণে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এই কথাগুলো এই তাপদগ্ধ সময়ে প্রায়শই স্মরণ হচ্ছে। কারণ- এখনও মানুষ প্রকৃতিকে বিভাজ্য জেনে এই রকমই আত্মপ্রতারণা করে চলেছে। অন্য মানুষ বা প্রাণীকূলের কথা বিবেচনায় না নিয়ে নিজের ঘরের গরম হাওয়া মানুষ যন্ত্র দিয়ে টেনে বাইরে ফেলে দিচ্ছে, নিজের ঘরকে ঠাণ্ডা রাখার জন্য ঘরের বাইরে রাত-দিন কার্বন হাগু করে চলেছে। আগের দিনের নদী-পুকুর ব্যবহারকারীদের মতোই সে ভাবছে, নিজের ধারেপাশের ময়লাটুকু দূরে ঠেলে দিলেই তার মুক্তি। মানুষ কি আসলে আত্মপ্রবঞ্চক না কি অবিমৃষ্যকারী? না কি দুটোই?

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাজার আগে রানী নয়

এক দেশে ছিল দুই নারী—একজনের নাম প্রজ্ঞা, আরেকজনের নাম অহংকার। দু’জনেই একই রকম সংসারে পা রেখেছিল। একই রকম উঠোন, একই রকম মানুষের ভিড়, একই রকম হাসি-কান্না। কিন্তু সময়ের সাথে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেল। প্রজ্ঞা বুঝেছিল, সংসার আসলে একটা রাজ্য। এ রাজ্যের রাজা শুধু একজন মানুষ নয়—এখানে শ্বশুরের সম্মান, শাশুড়ির মুখের হাসি, স্বামীর পরিশ্রম, ভাইবোনের সম্পর্ক—সব মিলেই রাজ্যের ভিত্তি। তাই সে নিজের হাতে সংসারের ভাঙা দেয়ালে রঙ করেছে, ক্লান্ত মানুষদের কপালে স্নেহের জল ছুঁইয়ে দিয়েছে, স্বামীর ছোট সাফল্যকেও মানুষের সামনে গর্ব করে বলেছে। লোকেরা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল— “কি সুন্দর পরিবার!” “কি ভদ্র ছেলে!” “কি সম্মানিত মানুষ!” আর সেই প্রশংসার আলো যখন পুরো পরিবারকে আলোকিত করল, তখন অজান্তেই প্রজ্ঞার মাথাতেও মুকুট উঠে এলো। কারণ মানুষ জানে— যে নারী একটি পরিবারকে সম্মানের আসনে বসাতে পারে, সে নিজেও সম্মানের যোগ্য। রাজ্য বড় হলে রানীর মর্যাদাও বড় হয়। অন্যদিকে অহংকার প্রতিদিন নিজের ঘরের মানুষদের ছোট করত। স্বামীর ব্যর্থতা নিয়ে মানুষের সামনে হাসত, শ্বশুরবাড়ির দোষ গল্পের মতো ছড়িয়ে বেড়াত, সম্পর্কের ক্ষতগুলোকে আড়াল না করে...

"পানোর্জেরনোর্জের মেষ"

ফরাসি সাহিত্যের একটা তাৎপর্যময় গল্প হলো Mouton de Panurge। দু মিনিট সময় নিয়ে গল্পটি পড়লে আশাকরি আমাদের চিন্তা কিছুটা শানিত হবে। ফরাসী ভদ্রলোক পানোর্জ নদী পার হতে নৌকার যাত্রী হয় । নদীটা বেশ স্রোতস্বীনি। একই নৌকায় যাত্রী হিসাবে ওঠে ডেনডুনো নামক এক মেষ ব্যবসায়ী। তার সাথে অসংখ্য মেষ। ডেনডুনো খুবই মুনাফা আর অর্থলোভী ব্যবসায়ী। মানবতাবোধ , মহত্ত্ব ইত্যাদি থেকে সে যোজন যোজন দূরে। তার জীবনের সমস্ত কিছু শুধু অর্থ আর মুনাফা দিয়ে ঠাসা। নৌকাটি যখন নদীর মাঝপথে ঠিক এমন সময় পানোর্জ এবং ডেনডুনোর মধ্যে বেশ বাকবিতন্ডা হয়। পানোর্জ প্রতিজ্ঞা করে সে মুনাফালোভী ডেনডুনোকে আজ একটা কঠিন শিক্ষা দিবে। পানোর্জ ডেনডুনোর কাছ থেকে বড় একটা মেষ বেশ উচ্চমূল্যে কিনে নেয়। মেষটিকে দেখেই মনে হচ্ছিলো এই মেষটিই মেষদলের দলপতি। অধিক মুনাফা পেয়ে ডেনডুনো খুবই খুশি। এরপর ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা। পানোর্জ মেষটির শিং ধরে শক্তভাবে টেনে নৌকার এক প্রান্তে নিয়ে যায় এবং মাঝ নদীতে ফেলে দেয়। দলপতি মেষকে অনুসরণ করতে গিয়ে অন্যান্য মেষগুলোও একের পর এক নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ডেনডুনো এটা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা। ঘটনার ...

সম্পর্ক ভাঙার আগে একবার ভাবুন…

সবাই সুখ খোঁজে, কিন্তু খুব কম মানুষ দায়িত্ব নিতে চায়। একটা সম্পর্ক হঠাৎ করে ভেঙে যায় না—ধীরে ধীরে ভাঙে। অবহেলা, না বলা কথা, আর অন্য কোথাও স্বস্তি খোঁজার অভ্যাস—এইগুলোই একসময় দূরত্ব তৈরি করে। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়— যে মানুষটা একসময় আপনার সবচেয়ে আপন ছিল, তাকে না বুঝে, না লড়েই ছেড়ে দেওয়া কি সত্যিই সমাধান? ভালোবাসা মানে শুধু ভালো লাগা না, ভালোবাসা মানে খারাপ সময়েও পাশে থাকার সিদ্ধান্ত। নতুন কারো কাছে শান্তি খোঁজার আগে, একবার ভেবে দেখুন—আপনি কি আপনার পুরোনো সম্পর্কটার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন? ভবে দেখুন বিপরিতের মানুষটা আপনার জন্য কি কিছুই করেনি?সে কি আপনার ভালোলাগা সবগুলোর মধ্য একটিও স্পর্শ করে নি?যদি না'ই হয় তাহলে আপনি কেনো এতোদিন তাকে সঙ্গ দিলেন? পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন? কারণ সম্পর্ক ভাঙা সহজ, কিন্তু একটা সত্যিকারের সম্পর্ক গড়ে তোলা—খুব কঠিন। চলুন, আমরা সাময়িক অনুভূতির চেয়ে স্থায়ী সম্পর্ককে মূল্য দিতে শিখি। বিশ্বাস ভাঙার আগে, একবার নিজের কাছেই প্রশ্ন করি— আমি কি সত্যিই আমার দায়িত্বটা পালন করেছি যেটা আমি তার কাছথেকে চাইছি?