সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

খাঁচার পাখিটা ছটফট করছে

। খাঁচার পাখিটা ছটফট করছে টিয়াপাখি। কথা বলা টিয়া। তরতর করে কথা বলে সে। লাল টকটকে মরিচের মতো ঠোঁট যার। খাঁচা ভাঙার চেষ্টা করছে খুব। খুব চেষ্টা করছে সে। হালকা সবুজ রঙের ডানা তার খসে খসে পড়ছে। ঝরে যাচ্ছে অঝর ধারায় নরম পালক একে একে সব। চোখ বেয়ে নামছে চাপা বিষণ্ণ ঝর্ণাধারা। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার, ভীষণ। টিয়ার আর্তনাদ খোপখোপ খাঁচা পেরিয়ে বেলকোনির শক্ত দেয়ালে এসে বিঁধছে বারবার। প্রবাহিত তীব্র কষ্টের প্রতিবিম্ব তারের খাঁচা চুরমার করে চারদেয়াল ভেঙ্গে ক্রমশ খুঁজে ফিরছে আকাশ, আলো, বাতাস। উড়তে চাইছে ডানা মেলে মায়াপুরের স্বাধীনতায়.. মুক্ত আকাশ ছোঁয়া স্বাধীনতায়। যে স্বাধীনতা তার থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে। তাকে রাখা হয়েছে খাঁচা নামের ওই যন্ত্রণার বন্দীশালায়। . ধুপ করে ঘুম ভেঙ্গে যায় পাখির। এটা আরেকটা পাখি, মানবপাখি। যে থাকে সারাবেলা চারদেয়ালে বন্দী। থালাবাসন মাজে। কাপড় কাঁচে। ঘর ঝাড়ু দেয়। কোমল নরম দু'হাত দিয়ে শক্ত মেঝে মুছে। ছোট্টখাট্টো মানুষটা আরও কত যে কাজ করে। সে ঘুমায় রান্নাঘরে। সে খায় ঝুটা খাবার। এটা কী তার প্রাপ্য? এটা কী তার স্বাধীনতা? এটা কী তার প্রতি কিছু মানুষের মুক্ত মানবতার তীব্র বহিঃপ্রকাশ? নাকি এটাই তার প্রাপ্তি? বেলকোনিতে খাঁচায় ঝুলে থাকা টিয়াপাখিটা ছটফট করছে। ভীষণ ছটফট করছে। আচ্ছা সে হঠাৎ এরকম দুঃস্বপ্ন দেখল কেন? ভাবছে মানব পাখিটা। আর দেরি করল না সে.. রান্নাঘর থেকে একদৌড়ে পাখি ছুটে গেল সোজা বেলকোনিতে। গিয়ে অপলক তার দৃষ্টি রাখল খাঁচায় বন্দী টিয়াপাখিটার দিকে। টিয়াপাখি-ও তাকায় মায়াভরে পাখির চোখে। কী যেন বলবে.. কী জানি বলবে.. কে আগে বলবে, কিন্তু কিছুই বলে না পাখি'দুটো। শুধু চেয়ে থাকে.. কেমন করে জানি চেয়ে থাকে.. কী মায়ায় দৃষ্টি রাখে একে অপরের চোখে.. আহা..ভালবাসা! মানবপাখি বলে, ও ডানাওয়ালা পাখি, তুমি কি আমায় তোমার ডানাজোড়া দেবে! আমি উড়ে বেড়াবো, আকাশের নীল দিগন্ত পেরিয়ে ওই মেঘ ছোঁব। এই শহর আমার আর ভাল্লাগেনা। আমি গাঁয়ে যাব। দু'মাস হল মা'কে দেখি না। মা'য়ের আঁচলের ঘ্রাণ শুঁকি না। টিয়াপাখি, ও ডানাওয়ালা টিয়াপাখি, তুমি কি তোমার ডানাজোড়া আমায় দেবে? কথা দিচ্ছি, আমি মা'য়ের কাছ থেকে ফিরে এসে ডানাজোড়া তোমায় ফেরত দেব। দেবে আমায়? টিয়াপাখি বলে, ও মানবপাখি! সকালের ওই সূর্য যখন ওঠে তখন আমি কেঁদে ফেলি আকাশ দেখে। দুঃখে, কষ্টে, বেদনায় ভেতরটা আমার হাহাকার করে যায়। ইশশ, যদি কখনো উড়ে যেতে পারতাম সাদা মেঘ ছুঁয়ে ছুঁয়ে। মিশে যেতে পারতাম নীলের অতলে। হারিয়ে যেতে পারতাম মাছরাঙাদের পুকুরে। ডালে ডালে বেড়াতে পারতাম নেচে নেচে মৌমাছিদের সাথে.. উফফফ! তুমি কি আমার গল্প জানো মানবপাখি? আমি ছোট্টবেলায় থাকতাম গ্রামের এক ঠাণ্ডা নিমগাছের গুহামুখে। কী শীতল পরিবেশ, বলে তোমায় বোঝাতে পারব না! তখনও আমি ডানামেলে উড়তে শিখি নি। মা'কে বলতাম, আমি তোমার মতো উড়ে বেড়াবো কবে মা? আমারও যে বাতাসের শরীরে ডানামেলে উড়ে উড়ে আকাশ ছুঁতে ইচ্ছে হয় খুব মা। মা বলতেন, একটু বড় হও। তোমাকে নিয়ে যাব ওই আকাশ পাড়ায়। নীল পেরিয়ে নিয়ে যাব সবুজ গ্রামে। ধানক্ষেত পেরিয়ে দেখবে উঁচু পাহাড়, সেখানে দেখতে পাবে স্বচ্ছ ঝর্ণাধারা.. গলগল করে পানি আছড়ে পড়ছে। পানির শব্দ শুনে তুমি মাতাল হয়ে যাবে। তোমারও ইচ্ছে হবে পানির মতন আছড়ে পড়তে। স্বচ্ছজলে গা ভেজাতে। তোমাকে নিয়ে যাব সেই গ্রামে.. একটু বড় হও আমার জানপাখি। একদিন মা বেরুলেন আমার জন্য খাবার সংগ্রহে। সকাল পেরিয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। মা আর আসেন না। আমি অপেক্ষা করছি। মা এই বুঝি উড়ে উড়ে আসছেন। ঝিল পেরিয়ে খাল, খাল পেরিয়ে পুকুর, পুকুর পেরিয়ে ক্ষেত, ক্ষেত পেরিয়ে আমার কাছে ছুটে আসছেন মা। খড়কুটো থেকে কিছুক্ষণ পরপর মিটিমিটি চোখে তাকিয়ে দেখছি.. মা বুঝি এইবার এল. এইতো এল.. কিন্তু! কিন্তু মা এলেন না। এল কিছু অমানুষ আমায় নিতে। কালো শক্ত হাতে খপুষ্ করে ধরে ফেলল আমায়। আমি ছোট্ট ঠোঁটে, চিকন কণ্ঠে চিৎকার দিতে আরম্ভ করলাম। বললাম, আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছো তোমরা? এই খাঁচাঘরে আমায় ঢোকাচ্ছো কেন? মা বলেছেন, আর ক'দিন বাদে আমি উড়তে শিখে যাব। আকাশ ছোঁব। বাতাসে সাঁতার কাটবো। গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াবো উড়ে উড়ে। আমার কথা শুনে তারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল.. হা হা হা.. তারপর.. তারপর আমায় নেয়া হল বাজারে। বাজার থেকে মরিচের দরে বিক্রি হলাম আমি। এক মেমসাহেব এসে বললেন, খাঁচার পাখির দাম কত? দোকানিঃ একদাম ১০০০/= মেমসাহেব আমায় কিনে নিলেন। উঠালেন তার দামি লাল রঙের গাড়িতে। প্রথমবার গাড়িতে উঠে আমার ভীষণ দম বন্ধ হয়ে আসছিল। খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার, খুব। এরপর গাড়ি থেকে নেমে মেমসাহেব তারের খাঁচাটা হাতে নিলেন। ভেতরে ঝুলছিলাম আমি। মেমসাহেব হাত দোলাচ্ছেন আর হাটছেন। হাটছেন আর দোলাচ্ছেন। আমি কেবল খাঁচার ভেতর দুলছি.. দুলছি তো দুলছি.. হাটতে হাটতে একটা কালো রঙের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন মেমসাহেব। দেয়ালে সুইচবোর্ড। মেমসাহেব একটা সুইট টিপলেন। অমনি দরজা ফাঁক হয়ে গেল। মা'য়ের কাছে গল্প শুনেছিলাম, আলীবাবা চল্লিশ চোর 'চিচিং ফাঁক' বললে দুই দিকের পাথর সরে যেত। আমি চমকে উঠলাম। আমাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন তিনি। প্রচণ্ড ভয় পেলাম। মনে শঙ্কা জাগল। কোথায় এলাম? কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আমায়? এভাবে এসে পড়লাম তোমার কাছে। পাখির কাছে। সেও বন্দী আমার মতন চারদেয়াল নামক খাঁচায়। আমাদের কত্ত মিল বলতো মানবপাখি..! . মানবপাখি কেঁদে ফেলল টিয়াপাখি'র জীবন শুনে, জীবনের গল্প শুনে। ঝরঝর গাল বেয়ে পানি তার ঠোঁটে। ঠুক্কুশ করে খাঁচার দরজা খুলে দিল সে। বলল, টিয়াপাখি তুমি উড়ে উড়ে এবার দিগন্ত জয় করে এসো। টিয়াপাখি খাঁচা থেকে বেরিয়ে পড়ল তৎক্ষণাৎ। ঝাপ দিল বাতাসে। ডানা এলিয়ে নিজেকে মেলে ধরল আকাশের নীলে। এটাই স্বাধীনতার প্রান্তরে (টিয়াপাখি'র আকাশছোঁয়া) প্রথম স্বাধ নেয়া। নিজেকে মেলে দেয়া। আহা.. কী অপূর্ব দৃশ্য! স্বাধীনতার দৃশ্য! স্বাধীন হবার দৃশ্য! আহা..! ভীষণ উচ্ছ্বাসিত মনে মানবপাখি চেয়ে চেয়ে টিয়াপাখি'র উড়ে বেড়ানো দেখছে..। বিস্তৃত নীলিমায় দৃষ্টি ডুবিয়ে গালভরা হাসি দিচ্ছে। এ খুশির যেন কোন সীমা নেই। অন্তহীন এক মায়া..। অচিনপুরের ঘোর..। আচ্ছা এভাবে চেয়ে থাকলেই কি তার হৃদয়ের ক্ষুধা মিটবে? মিটবে কি মনের ক্ষুধা? ছোট্ট মানবপাখি এমন কেন! যে অন্যের কষ্ট স্পর্শ করতে গিয়ে ভুলে যায় নিজের কষ্ট। অন্যের পিপাসা মেটাতে গিয়ে ভুলে যায় যে, সে নিজেই সাতসমুদ্র পাড়ি দেয়া এক আকাশ পিপাসিনী। যে অন্যের ইচ্ছে পূর্ণ করে স্বাধ নেয় নিজের লালিত কোন স্বপ্নের, অপূর্ণ প্রিয় কিছু ইচ্ছের। ছোট্ট মানবপাখি, তুমি সত্যি মানুষ তো! #পাগলের_প্রলপ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাজার আগে রানী নয়

এক দেশে ছিল দুই নারী—একজনের নাম প্রজ্ঞা, আরেকজনের নাম অহংকার। দু’জনেই একই রকম সংসারে পা রেখেছিল। একই রকম উঠোন, একই রকম মানুষের ভিড়, একই রকম হাসি-কান্না। কিন্তু সময়ের সাথে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেল। প্রজ্ঞা বুঝেছিল, সংসার আসলে একটা রাজ্য। এ রাজ্যের রাজা শুধু একজন মানুষ নয়—এখানে শ্বশুরের সম্মান, শাশুড়ির মুখের হাসি, স্বামীর পরিশ্রম, ভাইবোনের সম্পর্ক—সব মিলেই রাজ্যের ভিত্তি। তাই সে নিজের হাতে সংসারের ভাঙা দেয়ালে রঙ করেছে, ক্লান্ত মানুষদের কপালে স্নেহের জল ছুঁইয়ে দিয়েছে, স্বামীর ছোট সাফল্যকেও মানুষের সামনে গর্ব করে বলেছে। লোকেরা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল— “কি সুন্দর পরিবার!” “কি ভদ্র ছেলে!” “কি সম্মানিত মানুষ!” আর সেই প্রশংসার আলো যখন পুরো পরিবারকে আলোকিত করল, তখন অজান্তেই প্রজ্ঞার মাথাতেও মুকুট উঠে এলো। কারণ মানুষ জানে— যে নারী একটি পরিবারকে সম্মানের আসনে বসাতে পারে, সে নিজেও সম্মানের যোগ্য। রাজ্য বড় হলে রানীর মর্যাদাও বড় হয়। অন্যদিকে অহংকার প্রতিদিন নিজের ঘরের মানুষদের ছোট করত। স্বামীর ব্যর্থতা নিয়ে মানুষের সামনে হাসত, শ্বশুরবাড়ির দোষ গল্পের মতো ছড়িয়ে বেড়াত, সম্পর্কের ক্ষতগুলোকে আড়াল না করে...

"পানোর্জেরনোর্জের মেষ"

ফরাসি সাহিত্যের একটা তাৎপর্যময় গল্প হলো Mouton de Panurge। দু মিনিট সময় নিয়ে গল্পটি পড়লে আশাকরি আমাদের চিন্তা কিছুটা শানিত হবে। ফরাসী ভদ্রলোক পানোর্জ নদী পার হতে নৌকার যাত্রী হয় । নদীটা বেশ স্রোতস্বীনি। একই নৌকায় যাত্রী হিসাবে ওঠে ডেনডুনো নামক এক মেষ ব্যবসায়ী। তার সাথে অসংখ্য মেষ। ডেনডুনো খুবই মুনাফা আর অর্থলোভী ব্যবসায়ী। মানবতাবোধ , মহত্ত্ব ইত্যাদি থেকে সে যোজন যোজন দূরে। তার জীবনের সমস্ত কিছু শুধু অর্থ আর মুনাফা দিয়ে ঠাসা। নৌকাটি যখন নদীর মাঝপথে ঠিক এমন সময় পানোর্জ এবং ডেনডুনোর মধ্যে বেশ বাকবিতন্ডা হয়। পানোর্জ প্রতিজ্ঞা করে সে মুনাফালোভী ডেনডুনোকে আজ একটা কঠিন শিক্ষা দিবে। পানোর্জ ডেনডুনোর কাছ থেকে বড় একটা মেষ বেশ উচ্চমূল্যে কিনে নেয়। মেষটিকে দেখেই মনে হচ্ছিলো এই মেষটিই মেষদলের দলপতি। অধিক মুনাফা পেয়ে ডেনডুনো খুবই খুশি। এরপর ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা। পানোর্জ মেষটির শিং ধরে শক্তভাবে টেনে নৌকার এক প্রান্তে নিয়ে যায় এবং মাঝ নদীতে ফেলে দেয়। দলপতি মেষকে অনুসরণ করতে গিয়ে অন্যান্য মেষগুলোও একের পর এক নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ডেনডুনো এটা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা। ঘটনার ...

সম্পর্ক ভাঙার আগে একবার ভাবুন…

সবাই সুখ খোঁজে, কিন্তু খুব কম মানুষ দায়িত্ব নিতে চায়। একটা সম্পর্ক হঠাৎ করে ভেঙে যায় না—ধীরে ধীরে ভাঙে। অবহেলা, না বলা কথা, আর অন্য কোথাও স্বস্তি খোঁজার অভ্যাস—এইগুলোই একসময় দূরত্ব তৈরি করে। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়— যে মানুষটা একসময় আপনার সবচেয়ে আপন ছিল, তাকে না বুঝে, না লড়েই ছেড়ে দেওয়া কি সত্যিই সমাধান? ভালোবাসা মানে শুধু ভালো লাগা না, ভালোবাসা মানে খারাপ সময়েও পাশে থাকার সিদ্ধান্ত। নতুন কারো কাছে শান্তি খোঁজার আগে, একবার ভেবে দেখুন—আপনি কি আপনার পুরোনো সম্পর্কটার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন? ভবে দেখুন বিপরিতের মানুষটা আপনার জন্য কি কিছুই করেনি?সে কি আপনার ভালোলাগা সবগুলোর মধ্য একটিও স্পর্শ করে নি?যদি না'ই হয় তাহলে আপনি কেনো এতোদিন তাকে সঙ্গ দিলেন? পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন? কারণ সম্পর্ক ভাঙা সহজ, কিন্তু একটা সত্যিকারের সম্পর্ক গড়ে তোলা—খুব কঠিন। চলুন, আমরা সাময়িক অনুভূতির চেয়ে স্থায়ী সম্পর্ককে মূল্য দিতে শিখি। বিশ্বাস ভাঙার আগে, একবার নিজের কাছেই প্রশ্ন করি— আমি কি সত্যিই আমার দায়িত্বটা পালন করেছি যেটা আমি তার কাছথেকে চাইছি?