সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

শৈশবের বিকেল

সম্পুর্ন উন্মুক্ত বিশাল মাঠে ঘাসের ওই সবুজ ডগায় ডগায় ফুটেথাকা রং বে রং এর লক্ষ লক্ষ ফুল আর ফুলকে আকৃষ্ট হয়ে বসে থাকা কতো না রংবেরঙ'য়ের প্রজাপতি ধরতে ধরতে কেটেছে আমার শৈশবের কত বিকেল। আমি তখন একটু বড়! সাইকেলের রুপালী রিং আর একটা সরু কঞ্চী নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। মুক্তমাঠ পেরিয়ে আবার মাঠ আমি দৌঁড়ে বেড়াই। আমার সাথে দৌঁড়ে বেড়ায় রুপোলী রঙের রিং টাও। দুপুরের রোদ পড়তেই সেই রিংটা কেমন চিকচিক করে। খাল পেরিয়ে ছোটবড় বদ্ধ জলাশয়। সেই জলাশয় পেরিয়ে কত উঁচু নিচু অসমতল ভূমি। তারপর বিশাল পাহাড় সেই পাহাড়ের বড় ওই গাছতলায় দল বেধে বিশ্রাম। আহারে আমার শৈশব! আরেকটু বড় হলে আমি পাই মাটির ঘ্রাণ। পাই বৃষ্টির ঘ্রাণ। রোদের ঘ্রাণ। কেমন যেন জ্বলজ্বলে সব অনুভূতি। এসব ব্যাখ্যা করা যায় না! আমি বুঁদ হয়ে যাই আমার ছেলেবেলায়। সেই থেকে কানে এসে বিঁধত কিছু বর্ণ, কিছু শব্দ, কিছু কথা। আমি সেই বর্ণ গুলো সংগ্রহ করে কিছু শব্দ তৈরি করলাম। এরপর বাক্যে বাক্যে সাজালাম কথা। দেখতাম একটা স্বপ্ন। ভাবতাম অন্যরকম একটি পৃথিবী। একটা বিশাল মুক্ত আকাশ। সে এক নীল বিশাল আকাশ। পৃথিবীর উপর আছড়ে পড়া খানিক রুপোলী রোদ। তারপর হঠাৎ মেঘ করে বৃষ্টি! তাও আবার যেমন তেমন বৃষ্টি না। ঝুম বৃষ্টি। মেঘ ভেঙ্গে নামা সেই এক দীর্ঘ বৃষ্টি! উথালপাতাল করা ভেজা বাতাস। যেন মনে হবে, আমি হাতজোড়া মেললেই উড়ে যাচ্ছি ঘাশফুলের মতন মেঘের গ্রামে। সেই এক সরল গ্রাম। আমার কল্পনার গ্রাম। আমি চোখজোড়া বন্ধ করি আর আমার দু'হাত মেলে সেই কল্পনার গ্রামে উড়ে যাই। বাতাসে বাতাসে উড়ে চলি। কেমন যেন শিরশিরে এক ভাব। স্বচ্ছ জলাশয় পেরিয়ে এক বিশাল মাঠ, মাঠ পেরিয়ে সবুজ উঁচু পাহাড়। সেই পাহাড় ঘেঁষে আছড়ে পড়ছে জল। সেই ঝর্ণাজলে শরীর এলিয়ে আছড়ে পড়ছি আমিও। আহা কিএক প্রশান্তি! এরপর কল্পনা আর স্বপ্ন দেখে দেখে দিন যায়। সপ্তাহ যায়। মাস যায়। বছর যায়। বছর পেরিয়ে বছর আসে। বছর যায়। সেইসাথে বেড়ে উঠি আমিও। লিখে ফেলি একখানা কবিতা। আমার প্রথম কবিতা। "মুক্ত আকাশ, বদ্ধ জলাশয়, এই মাখা রোদ আমার দুপুর। সেই দুপুরে কেউ থাকে না, থাকি আমি আর আমার প্রীয় পোষ্য ছাড়া !" সেই কবিতা আমি আঙুল দিয়ে লিখে রেখে আসি জলাশয় পেরিয়ে মাঠ পেরিয়ে খাল পেরিয়ে উঁচু ঘাসহীন ওই পাহাড়ের সাদা মাটির গায়ে। তারপর বিশ্রামহীন এক দৌঁড়ে আমি এতটা পথ মাড়িয়ে বাড়ি ফিরে আসি। আমায় অনুসরণ করে দৌঁড়ে আসে লাল পোষ্য কুকুরটাও। যার নাম রেখেছিলাম আদর করে "বন্ধু"। যেই না আমি টেবিল থেকে আমার কলম খানা আর খাতা তুলে নেবো, ওমনি বিকট শব্দে কেঁপেউঠে ধরিত্রী আঁধারেও ভরেওঠে চারিদিক। সেই সে এক ভয়ঙ্কর শব্দ! আমি এক হাতের মুঠোয় শক্ত করে কলম ধরি। অন্য হাতের মুঠোয় কাগজ। সাদা একখানা কাগজ। তারপর বাহিরে বারান্দায় এসে দেখি আকাশ জুড়ে সেই কালো গুমটো মেঘ। এই আবহাওয়া আমার প্রতিকূলে দেখে আমি নিরাপদে রাখলাম সেই কাগজ খানাকে পকেটে বন্ধীকরে। তারপর দৌঁড়। সেই মুক্তমাঠ মাঠ পেরিয়ে জলাশয় পেরুতেই ঝুম করে নেমে এল বৃষ্টি। চমকাচ্ছে বিদ্যুৎ। সেইসাথে শব্দ, ভয়ানক শব্দ, গুঁড়ুম গুঁড়ুম! তবু এই শব্দে আমার বুক কাঁপেনা। ভয় করেনা, জাগেও না শঙ্কাও! আমি দৌঁড়াচ্ছি আর ভাবছি। ভাবছি আর দৌঁড়াচ্ছি! আমার কবিতার কি হবে? কবিতা? ওই যে পাহাড়ের সাদা মাটিতে লিখে রেখে আসা কবিতা খানা আমার! বৃষ্টি হচ্ছে, চমকাচ্ছে বিদ্যুৎ! আমি দৌঁড়াচ্ছি। কতগুলো মুক্ত জলাশয় কতোগুলো বদ্ধ জলাশয় তারপর অসমতল মাঠ আর ওই মেঘ ছুঁই ছুঁই করা পাহাড় পেরিয়ে অন্য একটা পাহাড় মাড়িয়ে আমি কেবল দৌঁড়াচ্ছি.. দৌঁড়াচ্ছি আর দৌঁড়াচ্ছি! খানিকবাদে বৃষ্টি থেমে গেছে! সেই পাহাড়ের সেই কাঙ্খিত যায়গায় থেমে গেছি আমিও। কিন্তু আমার কবিতা কই? কবিতা? সেই প্রথম লেখা মাটির কবিতার সাথে ধুয়ে মুছে চুপচুপে হয়ে গেছে আমার পকেটে বন্দী এই কাগজ খানাও! সেই মাটির কবিতা, পানির কবিতা, মিশে গেছে মাটিতে, তলিয়ে গেছে পানিতে!খানিকটা হতাশ খানিকটা নিস্তব্ধ খানিকটা নিরবতা আর একবুক কষ্ট নিয়ে ফিরি জীবনের হতাশায়...।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাজার আগে রানী নয়

এক দেশে ছিল দুই নারী—একজনের নাম প্রজ্ঞা, আরেকজনের নাম অহংকার। দু’জনেই একই রকম সংসারে পা রেখেছিল। একই রকম উঠোন, একই রকম মানুষের ভিড়, একই রকম হাসি-কান্না। কিন্তু সময়ের সাথে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেল। প্রজ্ঞা বুঝেছিল, সংসার আসলে একটা রাজ্য। এ রাজ্যের রাজা শুধু একজন মানুষ নয়—এখানে শ্বশুরের সম্মান, শাশুড়ির মুখের হাসি, স্বামীর পরিশ্রম, ভাইবোনের সম্পর্ক—সব মিলেই রাজ্যের ভিত্তি। তাই সে নিজের হাতে সংসারের ভাঙা দেয়ালে রঙ করেছে, ক্লান্ত মানুষদের কপালে স্নেহের জল ছুঁইয়ে দিয়েছে, স্বামীর ছোট সাফল্যকেও মানুষের সামনে গর্ব করে বলেছে। লোকেরা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল— “কি সুন্দর পরিবার!” “কি ভদ্র ছেলে!” “কি সম্মানিত মানুষ!” আর সেই প্রশংসার আলো যখন পুরো পরিবারকে আলোকিত করল, তখন অজান্তেই প্রজ্ঞার মাথাতেও মুকুট উঠে এলো। কারণ মানুষ জানে— যে নারী একটি পরিবারকে সম্মানের আসনে বসাতে পারে, সে নিজেও সম্মানের যোগ্য। রাজ্য বড় হলে রানীর মর্যাদাও বড় হয়। অন্যদিকে অহংকার প্রতিদিন নিজের ঘরের মানুষদের ছোট করত। স্বামীর ব্যর্থতা নিয়ে মানুষের সামনে হাসত, শ্বশুরবাড়ির দোষ গল্পের মতো ছড়িয়ে বেড়াত, সম্পর্কের ক্ষতগুলোকে আড়াল না করে...

"পানোর্জেরনোর্জের মেষ"

ফরাসি সাহিত্যের একটা তাৎপর্যময় গল্প হলো Mouton de Panurge। দু মিনিট সময় নিয়ে গল্পটি পড়লে আশাকরি আমাদের চিন্তা কিছুটা শানিত হবে। ফরাসী ভদ্রলোক পানোর্জ নদী পার হতে নৌকার যাত্রী হয় । নদীটা বেশ স্রোতস্বীনি। একই নৌকায় যাত্রী হিসাবে ওঠে ডেনডুনো নামক এক মেষ ব্যবসায়ী। তার সাথে অসংখ্য মেষ। ডেনডুনো খুবই মুনাফা আর অর্থলোভী ব্যবসায়ী। মানবতাবোধ , মহত্ত্ব ইত্যাদি থেকে সে যোজন যোজন দূরে। তার জীবনের সমস্ত কিছু শুধু অর্থ আর মুনাফা দিয়ে ঠাসা। নৌকাটি যখন নদীর মাঝপথে ঠিক এমন সময় পানোর্জ এবং ডেনডুনোর মধ্যে বেশ বাকবিতন্ডা হয়। পানোর্জ প্রতিজ্ঞা করে সে মুনাফালোভী ডেনডুনোকে আজ একটা কঠিন শিক্ষা দিবে। পানোর্জ ডেনডুনোর কাছ থেকে বড় একটা মেষ বেশ উচ্চমূল্যে কিনে নেয়। মেষটিকে দেখেই মনে হচ্ছিলো এই মেষটিই মেষদলের দলপতি। অধিক মুনাফা পেয়ে ডেনডুনো খুবই খুশি। এরপর ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা। পানোর্জ মেষটির শিং ধরে শক্তভাবে টেনে নৌকার এক প্রান্তে নিয়ে যায় এবং মাঝ নদীতে ফেলে দেয়। দলপতি মেষকে অনুসরণ করতে গিয়ে অন্যান্য মেষগুলোও একের পর এক নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ডেনডুনো এটা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা। ঘটনার ...

সম্পর্ক ভাঙার আগে একবার ভাবুন…

সবাই সুখ খোঁজে, কিন্তু খুব কম মানুষ দায়িত্ব নিতে চায়। একটা সম্পর্ক হঠাৎ করে ভেঙে যায় না—ধীরে ধীরে ভাঙে। অবহেলা, না বলা কথা, আর অন্য কোথাও স্বস্তি খোঁজার অভ্যাস—এইগুলোই একসময় দূরত্ব তৈরি করে। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়— যে মানুষটা একসময় আপনার সবচেয়ে আপন ছিল, তাকে না বুঝে, না লড়েই ছেড়ে দেওয়া কি সত্যিই সমাধান? ভালোবাসা মানে শুধু ভালো লাগা না, ভালোবাসা মানে খারাপ সময়েও পাশে থাকার সিদ্ধান্ত। নতুন কারো কাছে শান্তি খোঁজার আগে, একবার ভেবে দেখুন—আপনি কি আপনার পুরোনো সম্পর্কটার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন? ভবে দেখুন বিপরিতের মানুষটা আপনার জন্য কি কিছুই করেনি?সে কি আপনার ভালোলাগা সবগুলোর মধ্য একটিও স্পর্শ করে নি?যদি না'ই হয় তাহলে আপনি কেনো এতোদিন তাকে সঙ্গ দিলেন? পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন? কারণ সম্পর্ক ভাঙা সহজ, কিন্তু একটা সত্যিকারের সম্পর্ক গড়ে তোলা—খুব কঠিন। চলুন, আমরা সাময়িক অনুভূতির চেয়ে স্থায়ী সম্পর্ককে মূল্য দিতে শিখি। বিশ্বাস ভাঙার আগে, একবার নিজের কাছেই প্রশ্ন করি— আমি কি সত্যিই আমার দায়িত্বটা পালন করেছি যেটা আমি তার কাছথেকে চাইছি?