সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমি ও আমার জিবনের বাস্তব গল্প।

সাল টা ১৯৯৭ এপ্রিল ২৩ বয়স ৪ বছর সকালে আমার বাবা আবিষ্কার করলো আমি আমার যে মায়ের কোলে কান্না করছি তিনি আর পৃথিবীতে নাই।ঐ বয়সে কে জানতো পরবর্তী রাতগুলো মা ছাড়া আমাকে ঘুমাতে হবে,আমার মা আর কখনওই আমাকে কোলে নেবেন না,খাইয়ে দেবেন না।কিন্তু এই দুঃখ অবসানের সুযোগ আসলো কয়েক মাসের পরে আশায় বুকবাঁধতে শুরুকরলাম অবশেষে ১৯৯১ সালের নভেম্বর ১৩ তারিখ আমার নুতন মা আমাকে আবারও কোলেতুলে নিলেন।স্নান ঘুম খাওয়া সবসময় সবটুকুতেই তিনি ছিলেন আমার চারপাশে। মাঝে মাঝে আমি যখন দুষ্টুমি করলে বাবা বকাদিতেন তখন মা খুব রাগকরতেন, এমনকি কান্নাও করতেন শুনেছি খুব সুখে ছিলাম আনন্দেও ছিলাম। জন্মটাই যেখানে আজন্ম পাপ সেখানে সুখ কি দীর্ঘস্থায়ী হয় কিনা আমার জানা নাই তবে আমারও হয়নি?একদিন সকালে মা রান্না করছিলেন আমি উঠানে খেলছিলাম হঠাৎ একটা কুকুর এসে আমাকে কামড়ে দেয় আমি ভয়পেয়ে দৌড়ে মায়ের কাছে আসতে গিয়ে জানিনা কিভাবে গরম মাত্র নামিয়েরাখা তরকারি এবং কড়াইয়ের গরম তেল মায়ের গায়ে পড়ে ঝলসে যায় আর প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাঁদতে দেখে ভয়ে আমি লুকিয়ে গেছিলাম খড়ের স্তুপের নিচে। পরে বাবা আমাকে খুজেপেয়ে খুবমার মেরেছিলেন দুদিন পড়েছিলাম বিছানায় প্রতিবেশী এক ঠাকুমার বিছানায় অবশ্য ঠাকুমা আমার কাছে প্রথম এবং শেষ জানতে চাওয়া ব্যক্তি ছিলেন যে আমি কেনো মায়ের গায়ে গরম তেল ও তরকারি ঢেলে দিয়েছি! আমি সবিস্তর বললে তিনি আমার জন্য কলাপড়া এনে খাইয়েছিলেন। আবদার করলাম মায়ের কাছে যাবো, তখনও হাটতে পারছিলাম না ঠাকুমার কোলে চড়ে বাড়িতে গিয়ে মা বলে ডাকতেই জবাব এলো " নিজের মা কে খেয়েছিস তাতে হয় নি?তোর মা মারা গেছে এটা তোর মা না, আমার মেয়ের সাথে তোর কোন সম্পর্ক নেই! দিদিমা আরও বললেন ওই ছেলে যদি এই বাড়িতে থাকে আমি আমার মেয়েকে নিয়ে চলেযাবো সিদ্ধান্ত নাও আমার মেয়েকে রাখবে নাকি এই ছেলেকে"। তাকিয়ে ছিলাম আমার মা কিছু বলবে নাহয় বাবা তো কিছু করবে। কিন্তু না করতে হয়েছিলো আমার খুব কান্না, উঠানের ধুলায় লুটোপুটি,দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয় বাবা,মা, দিদিমা সবাই চারপাশে ঘুরছে আমি হয়তো ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়েছিলাম কিন্তু কেউ কোলে তুলে নেয় নি পরে নিজে বারন্দায় যাওয়ার চেষ্টা করি ব্যথাতুর শরীর নিয়ে কোথাথেকে দিদিমা ছুটে এসে বারন্দা থেকে টেনে নিচে নামিয়ে দেয় তখন ওইটুকু বয়সে দেখেছিলাম সন্তানের সামনে বাবার অসহায়ত্ব,মা আর সন্তানের কঠোর সম্পর্কের বুনন।একদিকে হয়তো আমার বাবা মায়ের নিস্তব্ধ নিরব কান্না অপর দিকে আমার তাদের কাছে থেকেযাওয়ার তিব্র আর্তনাদ।সন্ধা ঘোর হয়ে এলো মা বাবা আর দিদিমার মধ্য ঝগড়া শুরু হলো, কিছু সময় পর এগিয়ে এসে বাবা কোলে নিয়ে বেরিয়ে আসলেন রাস্তায় তখনও জানতাম না ঐ বাড়িতে আমার আর জায়গা হবে না আমারি মা বাবা আমার প্রতিবেশী হতে চলেছে আমি খুব কান্নাকাটি করছিলাম তখন ঐ ঠাকুমা এসে আমাকে কোলে নিয়ে আবার তার বাসায় নিয়েগেলেন। স্নান করিয়ে খাইয়ে সারারাত আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন কেনোনা বাবার মাইরের তোড়ে পা মচকে গেছিলো কয়েক জায়গা ফেটে রক্ত ঝরছিলো।সকালে ডাক্তার এসে ঔষধ দিলে কয়দিনে সব সেরে যায় কিন্তু আপন মানুষ পরহয়ে পর মানুষ হয়েওঠে আপন। তবে খুব ইচ্ছা হতো মা বাবার কাছে যেতে তাদের সাথে থাকতে কতোবার ছুটে গেছি কিন্তু মা কথা বলতেন না, বাবা গ্রামের দোকান থেকে মাঝেমাঝে খাবারর কিনে দিতেন খুব ভালোলাগতো তখন।একবার পুজায় বাবা আমাকে একটা জামা দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন কেউ যেনো না জানে জামাটা আমি দিয়েছি আজও আমি গায়ে পরার সাহস পাইনি সেই অজানা ভয়ে কিন্তু প্রতি বছর পুজায় জামাটা একটু বুকে জড়িয়ে রাখি। জানিনা কখনও বাবা আমার ভরণপোষণ খরচ ঠাকুমাকে দিতো কি না তবে প্রতিদিন ৩/৪ বস্তা ঘাস কেটে বিক্রি করতাম ৫০/৬০ টাকায় আর তুলে দিতাম ঠাকুমার হাতে, তবে সব হারিয়ে ঠাকুমার সাথে খুব সুখেই দিন কাটছিলো বয়স তখন ১১ বছর ক্লাস সিক্স এ পড়ি, কিন্তু সৃষ্টিকর্তা হয়তো সুখ আমার জন্য রেখেছিলো খুব সামান্য, ঠাকুমার বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরও খারাপ হতে থাকে,তবে ওনার এক ছেলে ছিলেন তিনি পরিবার নিয়ে ইন্ডিয়াতে থাকতেন হঠাৎ তিনি দেশে এসে জমিজমা বিক্রি করে ঠাকুমাকে নিয়ে চলেগেলেন খুব কেঁদেছিলাম আমি আর আমার ঠাকুমা যখন আমার শেষ আশ্রয়টুকু ও হারিয়েছিলাম। আশ্রয়হীন হয়ে কয়েকদিন মন্দিরে ছিলাম,এতোদিন পরে এলেন আমার মামা আমাকে নিতে খানিকটা বাধ্যহয়ে অপরিচিত একটি পরিবারের সাথে শুরুহয় নুতন পথচলা, পড়াশুনার পাশাপাশি মামার মুদির দোকানে কাজের সাহায্য করাই ছিলো আমারা কাজ।বেশ চলছিলো হঠাৎ একদিন মামার দোকানে আগুনলেগে সব শেষ হয়ে যায়। তখন আমি অষ্টম শ্রেণীতে মামার পরিবার অভাবে নাজুক অবস্হা হয়ে পড়ে।শুরু করি অন্যের দোকানে কাজ দিন ২৫০ টাকায় সাহায্যের হাতবাড়াই মামার পরিবারে স্কুল যাওয়া বন্ধহয়ে যায় পরে আমার অনুরোধে মৃন্ময় স্যরের সহযোগীতায় পরিক্ষা গুলো দিলেই হবে ক্লাশ করতে হবে না এমন একটা সুযোগ পাই চলতে থাকে জিবন ও যুদ্ধ । চলেআসে SSC পরীক্ষা তখন দোকানে রাতে থাকার ব্যবস্হা করেদেন মতিয়ার মামা যাতে পড়াশুনার একটু সুযোগ পাই, মায়ের আর্শিবাদে পরীক্ষা দিলাম এবং 3.56(A-) পেলাম,যেখানে পাশ করাটা আমার কাছে ছিলো খুব জরুরী। কলেজে ভর্তি হলাম শুরু করলাম টিউশনি আর মতিয়ার মামার দোকানের SR হিসাবে মার্কেটে অর্ডার সংগ্রহ কেনো জানি মনেহলো টিউশনিতে মন বসছে না Sales & Marketing আমার জন্য ভালো হবে,মামা একটা ভ্যান আর একজন চালক দিলো মাসিক বেতন ৯০০০ টাকা। HSC পরীক্ষা দিলাম ৪.০৬(A) পেলাম তবুও খুশি,শুরু করলাম মামার দোকানের ম্যনেজারী, মন টিকলো না পড়াশুনায়ও মন বসলো না আর। মামা তখন যোগাযোগ করে দিলো মার্কুইজ মটর কোম্পানিতে SR হিসাবে, টানা ৪ বছর কাজ করি সেখানে তারপর PRAN-RFL এ ৭ বছর বর্তমানে JD INTERNATIONAL এ , এর মাঝে নিজের একটা পরিবার হয়েছে স্ত্রী সন্তান নিয়ে, আমার প্রীয় মা বাবাকে আমার কাছে এনে রেখেছি মামা মামিকে সামান্য সহযোগীতার চেষ্টা করি কিন্তু আজও খুজেপাইনি আমার জিবনের সবচেয়ে প্রীয় সেই ঠাকুমাকে। সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার আজন্ম প্রার্থনা তুমি আমার ঠাকুমা কে যেখানেই রাখো ভালো রেখো।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাজার আগে রানী নয়

এক দেশে ছিল দুই নারী—একজনের নাম প্রজ্ঞা, আরেকজনের নাম অহংকার। দু’জনেই একই রকম সংসারে পা রেখেছিল। একই রকম উঠোন, একই রকম মানুষের ভিড়, একই রকম হাসি-কান্না। কিন্তু সময়ের সাথে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেল। প্রজ্ঞা বুঝেছিল, সংসার আসলে একটা রাজ্য। এ রাজ্যের রাজা শুধু একজন মানুষ নয়—এখানে শ্বশুরের সম্মান, শাশুড়ির মুখের হাসি, স্বামীর পরিশ্রম, ভাইবোনের সম্পর্ক—সব মিলেই রাজ্যের ভিত্তি। তাই সে নিজের হাতে সংসারের ভাঙা দেয়ালে রঙ করেছে, ক্লান্ত মানুষদের কপালে স্নেহের জল ছুঁইয়ে দিয়েছে, স্বামীর ছোট সাফল্যকেও মানুষের সামনে গর্ব করে বলেছে। লোকেরা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল— “কি সুন্দর পরিবার!” “কি ভদ্র ছেলে!” “কি সম্মানিত মানুষ!” আর সেই প্রশংসার আলো যখন পুরো পরিবারকে আলোকিত করল, তখন অজান্তেই প্রজ্ঞার মাথাতেও মুকুট উঠে এলো। কারণ মানুষ জানে— যে নারী একটি পরিবারকে সম্মানের আসনে বসাতে পারে, সে নিজেও সম্মানের যোগ্য। রাজ্য বড় হলে রানীর মর্যাদাও বড় হয়। অন্যদিকে অহংকার প্রতিদিন নিজের ঘরের মানুষদের ছোট করত। স্বামীর ব্যর্থতা নিয়ে মানুষের সামনে হাসত, শ্বশুরবাড়ির দোষ গল্পের মতো ছড়িয়ে বেড়াত, সম্পর্কের ক্ষতগুলোকে আড়াল না করে...

"পানোর্জেরনোর্জের মেষ"

ফরাসি সাহিত্যের একটা তাৎপর্যময় গল্প হলো Mouton de Panurge। দু মিনিট সময় নিয়ে গল্পটি পড়লে আশাকরি আমাদের চিন্তা কিছুটা শানিত হবে। ফরাসী ভদ্রলোক পানোর্জ নদী পার হতে নৌকার যাত্রী হয় । নদীটা বেশ স্রোতস্বীনি। একই নৌকায় যাত্রী হিসাবে ওঠে ডেনডুনো নামক এক মেষ ব্যবসায়ী। তার সাথে অসংখ্য মেষ। ডেনডুনো খুবই মুনাফা আর অর্থলোভী ব্যবসায়ী। মানবতাবোধ , মহত্ত্ব ইত্যাদি থেকে সে যোজন যোজন দূরে। তার জীবনের সমস্ত কিছু শুধু অর্থ আর মুনাফা দিয়ে ঠাসা। নৌকাটি যখন নদীর মাঝপথে ঠিক এমন সময় পানোর্জ এবং ডেনডুনোর মধ্যে বেশ বাকবিতন্ডা হয়। পানোর্জ প্রতিজ্ঞা করে সে মুনাফালোভী ডেনডুনোকে আজ একটা কঠিন শিক্ষা দিবে। পানোর্জ ডেনডুনোর কাছ থেকে বড় একটা মেষ বেশ উচ্চমূল্যে কিনে নেয়। মেষটিকে দেখেই মনে হচ্ছিলো এই মেষটিই মেষদলের দলপতি। অধিক মুনাফা পেয়ে ডেনডুনো খুবই খুশি। এরপর ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা। পানোর্জ মেষটির শিং ধরে শক্তভাবে টেনে নৌকার এক প্রান্তে নিয়ে যায় এবং মাঝ নদীতে ফেলে দেয়। দলপতি মেষকে অনুসরণ করতে গিয়ে অন্যান্য মেষগুলোও একের পর এক নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ডেনডুনো এটা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা। ঘটনার ...

সম্পর্ক ভাঙার আগে একবার ভাবুন…

সবাই সুখ খোঁজে, কিন্তু খুব কম মানুষ দায়িত্ব নিতে চায়। একটা সম্পর্ক হঠাৎ করে ভেঙে যায় না—ধীরে ধীরে ভাঙে। অবহেলা, না বলা কথা, আর অন্য কোথাও স্বস্তি খোঁজার অভ্যাস—এইগুলোই একসময় দূরত্ব তৈরি করে। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়— যে মানুষটা একসময় আপনার সবচেয়ে আপন ছিল, তাকে না বুঝে, না লড়েই ছেড়ে দেওয়া কি সত্যিই সমাধান? ভালোবাসা মানে শুধু ভালো লাগা না, ভালোবাসা মানে খারাপ সময়েও পাশে থাকার সিদ্ধান্ত। নতুন কারো কাছে শান্তি খোঁজার আগে, একবার ভেবে দেখুন—আপনি কি আপনার পুরোনো সম্পর্কটার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন? ভবে দেখুন বিপরিতের মানুষটা আপনার জন্য কি কিছুই করেনি?সে কি আপনার ভালোলাগা সবগুলোর মধ্য একটিও স্পর্শ করে নি?যদি না'ই হয় তাহলে আপনি কেনো এতোদিন তাকে সঙ্গ দিলেন? পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন? কারণ সম্পর্ক ভাঙা সহজ, কিন্তু একটা সত্যিকারের সম্পর্ক গড়ে তোলা—খুব কঠিন। চলুন, আমরা সাময়িক অনুভূতির চেয়ে স্থায়ী সম্পর্ককে মূল্য দিতে শিখি। বিশ্বাস ভাঙার আগে, একবার নিজের কাছেই প্রশ্ন করি— আমি কি সত্যিই আমার দায়িত্বটা পালন করেছি যেটা আমি তার কাছথেকে চাইছি?