১৯৯৭ সালের এপ্রিলের ২৩ তারিখ,
তখন আমার বয়স চার…
ঘুমভাঙা সকাল, গাছে গাছে টলমল কুয়াশা—
আর আমার ছোট্ট বুক জুড়ে হাহাকার।
আমি মায়ের কোলে—চুপচাপ, চোখে জল।
আর বাবা দাঁড়িয়ে স্তব্ধ, বিস্ময়ে বিমূঢ়…
মায়ের নিথর মুখ, নিস্তব্ধ দেহ—
সেদিনই প্রথম বুঝলাম, ‘চিরতরে চলে যাওয়া’ বলতে কী বোঝায়।
সেই থেকে রাতেরা নিঃস্ব হলো, বালিশ ভিজল নীরবে,
মা আর আসেন না,
না গল্প শুনিয়ে, না ভাতের মুঠো হাতে—
সেদিনের কান্না হয়তো এখনো
আমার শিরায় রয়ে গেছে বয়ে।
তবু কয়েক মাস পর, এক আশার আলো ফুটে ওঠে।
নতুন এক মায়ের কোলে আমি আবার আশ্রয় খুঁজি—
১৩ নভেম্বর, ১৯৯৭।
সে মা ছিলেন কোমল, তিনি ছিলেন নিঃস্বার্থ।
তিনি আবার আমাকে ঘুম পাড়াতেন,
স্নান করাতেন, খাওয়াতেন, আগলে রাখতেন সমস্ত ক্লান্তি ও দুঃখ থেকে।
আমি দুষ্টুমি করলেই বাবা বকতেন,
আর মা রাগে চোখ ভিজিয়ে ফেলতেন—
শুনেছি, সেই ছিল আমাদের ছোট্ট সুখের সংসার।
কিন্তু সুখ তো যেন আমার জীবনে অতিথি মাত্র—
একদিন উঠানে খেলছিলাম,
মা তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত।
হঠাৎ এক কুকুর আমার পেছনে লেগে গেল,
আমি আতঙ্কে ছুটলাম মায়ের দিকে।
ভয় আর কান্নার হুলস্থুলে…
গরম তরকারি আর ফুটন্ত তেল পড়ে গেল মায়ের গায়ে।
তার চিৎকার, তার ছটফটানি—
আমাকে করে তুলল পাথর।
আমি লুকিয়ে পড়লাম খড়ের গাদায়।
পরে বাবা খুঁজে পেয়ে বেদম মার দিলেন…
আমি বিছানায় পড়ে থাকলাম নিঃশব্দে, ব্যথায়।
এক বৃদ্ধা ঠাকুমা জানতে চাইলেন,
"তুই কেন মা’কে পুড়িয়ে দিলি রে বাপু?"
সব বললাম তাঁকে—তিনি শুধু বললেন না কিছু,
চোখে জল নিয়ে শুধু আমার মুখে তুলে দিলেন ভাত।
দু’দিনের মাথায় হাঁটতে পারিনি,
তবু বললাম, “মায়ের কাছে যাব।”
ঠাকুমার কোল জড়িয়ে বাড়িতে ফিরি।
ঘরে ঢুকেই কাঁপা গলায় ডাকি,
“মা…”
জবাব আসে কঠিন,
"তোর মা মরে গেছে,
এই আমার মেয়ে,
তোর আর কোনো সম্পর্ক নেই!"
আমার ছোট্ট বুকটায় সেদিন
বিশ্বভাঙা এক শব্দ গেঁথে গিয়েছিলো—
"সম্পর্ক নেই…"
দিদিমার হুকুম,
"এই ছেলে যদি বাড়িতে থাকে
আমি মেয়েকে নিয়ে চলে যাবো।"
বাবা চুপ।
মা চুপ।
আমার ডাক পড়েনি কারও কণ্ঠে।
আমি উঠোনে গড়িয়ে কাঁদি,
ধুলোর সাথে মিশে যাই যেন—
কেউ কাছে আসে না।
শেষে বারান্দার দিকে হেঁটে যেতে চেয়েছিলাম,
তখনও শরীর ব্যথায় কুঁকড়ে আছে।
দিদিমা ছুটে এসে টেনে ফেলে দেয়…
আমি তাকিয়ে দেখি,
এক সন্তানের সামনে
কীভাবে অসহায় হয়ে যায় তার বাবা।
সন্ধ্যা নামছে…
চারদিকে শুধু ঝগড়া আর কান্না।
হঠাৎ বাবা আমাকে কোলে নেন,
চলে আসেন অন্ধকার রাস্তায়—
আর কখনোই ফিরে যাইনি ঐ বাড়িতে।
মা-বাবা হয়ে গিয়েছিলেন আমার প্রতিবেশী।
আমার চোখে জল,
বুকে কষ্ট, পায়ে যন্ত্রণা।
এক সময় সেই ঠাকুমা আবার এসে আমাকে কোলে নেন।
স্নান করান, খাওয়ান,
সারারাত বুকে আঁকড়ে রাখেন—
কারণ তখনও আমার পা ফেটে রক্ত পড়ছে।
ডাক্তার এলো সকালে,
ওষুধ দিল, দিন পেরোল…
ব্যথা কমলো।
কিন্তু "মা" আর "বাড়ি"—
সেগুলো থেকে আমি ক্রমেই ছিটকে যাচ্ছিলাম।
তবুও আমি চেয়ে থাকতাম—
মা একবার যদি ডাকেন,
বাবা একবার যদি বলেন,
"আয় আমার ছেলেটা…"
কিন্তু না।
শুধু একবার, পূজার সময়
বাবা একটা জামা এনে বললেন,
“কাউকে বলিস না, আমি দিয়েছি…”
আজও আমি সে জামা গায়ে দিইনি,
অজানা এক ভয় আর না বলা অভিমানে।
১১ বছর বয়স তখন, ক্লাস সিক্সে পড়ি।
ঠাকুমাই তখন আমার পৃথিবী,
আমার মা, আমার আশ্রয়,
আমার সব।
তাঁর বয়স বাড়ছিলো, শরীর ভাঙছিলো।
একদিন তাঁর ছেলে,
ভারত থেকে ফিরে জমিজমা বিক্রি করলেন,
আর ঠাকুমাকে নিয়ে চলে গেলেন।
আমার হৃদয় ভেঙে গেল।
আমি জানতাম না—
শেষ আশ্রয়টাও হারানোর কষ্ট এতটা গাঢ় হতে পারে।
মন্দিরের বারান্দায় রাত কাটাতাম,
ভাত জুটতো না, সঙ্গীও না।
তখনই আমার মামা এসে আমাকে তুলে নিলেন,
এক অপরিচিত পরিবারে শুরু হলো
জীবনের নতুন অধ্যায়।
এক দেশে ছিল দুই নারী—একজনের নাম প্রজ্ঞা, আরেকজনের নাম অহংকার। দু’জনেই একই রকম সংসারে পা রেখেছিল। একই রকম উঠোন, একই রকম মানুষের ভিড়, একই রকম হাসি-কান্না। কিন্তু সময়ের সাথে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেল। প্রজ্ঞা বুঝেছিল, সংসার আসলে একটা রাজ্য। এ রাজ্যের রাজা শুধু একজন মানুষ নয়—এখানে শ্বশুরের সম্মান, শাশুড়ির মুখের হাসি, স্বামীর পরিশ্রম, ভাইবোনের সম্পর্ক—সব মিলেই রাজ্যের ভিত্তি। তাই সে নিজের হাতে সংসারের ভাঙা দেয়ালে রঙ করেছে, ক্লান্ত মানুষদের কপালে স্নেহের জল ছুঁইয়ে দিয়েছে, স্বামীর ছোট সাফল্যকেও মানুষের সামনে গর্ব করে বলেছে। লোকেরা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল— “কি সুন্দর পরিবার!” “কি ভদ্র ছেলে!” “কি সম্মানিত মানুষ!” আর সেই প্রশংসার আলো যখন পুরো পরিবারকে আলোকিত করল, তখন অজান্তেই প্রজ্ঞার মাথাতেও মুকুট উঠে এলো। কারণ মানুষ জানে— যে নারী একটি পরিবারকে সম্মানের আসনে বসাতে পারে, সে নিজেও সম্মানের যোগ্য। রাজ্য বড় হলে রানীর মর্যাদাও বড় হয়। অন্যদিকে অহংকার প্রতিদিন নিজের ঘরের মানুষদের ছোট করত। স্বামীর ব্যর্থতা নিয়ে মানুষের সামনে হাসত, শ্বশুরবাড়ির দোষ গল্পের মতো ছড়িয়ে বেড়াত, সম্পর্কের ক্ষতগুলোকে আড়াল না করে...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন