সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

"যে মানুষটা আমার ছিল, সে আর শুধু আমার রইল না"

ভালোবাসা কখনো শব্দে মাপা যায় না। ভালোবাসা বোঝা যায় অপেক্ষায়, ত্যাগে, আর একজন মানুষের জন্য নিজের সবকিছু নিঃস্বার্থভাবে দিয়ে দেওয়ার মধ্যে। আমি ঠিক তেমন করেই তাকে ভালোবাসছিলাম। আমাদের সংসার ছিল আজও আছে। ছোট ছোট স্বপ্ন ছিল এখনও আছে তবে গাড় অন্ধকারে অস্পষ্ট। আমি ভাবতাম, পৃথিবী যদি একদিন আমার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবুও সে আমার হাত ছাড়বে না। একদিন রাতে সে আমার কাঁধে মাথা রেখে বলেছিল, — "শোনো, তুমি যদি কোনোদিন আমাকে ছেড়ে চলে যাও, আমি বাঁচব না।" আমি হেসে বলেছিলাম, — "আমি কেন যাব? আমার পুরো পৃথিবী তো তুমি।" সেদিন জানতাম না, চলে যাওয়ার জন্য সব সময় শরীরের দূরত্ব লাগে না। কখনো কখনো মানুষ পাশে থেকেও অনেক দূরে চলে যায়। ... ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল সবকিছু। আগের মতো আর ফোন করত না। আমার মেসেজের উত্তর আসত অনেক দেরিতে। আমি কিছু জিজ্ঞেস করলে বলত, — "তুমি এত সন্দেহ করো কেন?" আমি চুপ করে যেতাম। কারণ আমি সন্দেহ করতে চাইনি। আমি শুধু তাকে হারাতে চাইনি। একদিন সত্যিটা জানতে পারলাম। আমার বুকের ভেতরটা যেন কেউ ছিঁড়ে ফেলল। সে শুধু আমার ছিল না। তার জীবনে আরেকজনও ছিল। সেদিন রাতে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, — "একটা কথা বলো... আমি কি তোমাকে কম ভালোবেসেছি?" সে অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, — "না... তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো।" আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, — "তাহলে কেন?" তার চোখে পানি ছিল। কিন্তু সেই কান্না আমার ভাঙা হৃদয় আর জোড়া লাগাতে পারেনি। ... এরপরও আমি সম্পর্কটা বাঁচাতে চেয়েছিলাম। আমি নিজের অহংকার ভুলে তার সামনে বসে বলেছিলাম, — "তুমি যদি আজ সব শেষ করে আমার কাছে ফিরে আসো, আমি কোনোদিন এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলব না। শুধু আগের মতো আমাকে ভালোবেসো।" সে মাথা নিচু করে বলল, — "আমি চেষ্টা করছি... কিন্তু তাকে ভুলতে পারছি না।" এই একটা বাক্য আমার পুরো পৃথিবী শেষ করে দিয়েছিল। সেদিন বুঝেছিলাম, একজন মানুষ একই সঙ্গে দুজনকে ভালোবাসতে পারে—কিন্তু যে মানুষটা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে, তার ভাগ্যে শুধু কান্নাই লেখা থাকে। ... এরপরও সে আমার পাশে থাকত। আমার জন্য রান্না করত। আমি অসুস্থ হলে ওষুধ খাওয়াত। কিন্তু আমি জানতাম... তার হৃদয়ের একটা অংশ অন্য কারও কাছে রেখে এসেছে। এই অনুভূতির চেয়ে বড় যন্ত্রণা পৃথিবীতে খুব কম আছে। ... এক রাতে আমি ঘুমানোর ভান করেছিলাম। দেখলাম সে চুপচাপ ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছে। তার ঠোঁটে যে হাসিটা দেখলাম... সেই হাসিটা একসময় শুধু আমার জন্য ছিল। আমি চোখ বন্ধ করে শুধু একটা কথাই মনে মনে বলেছিলাম, "হে ঈশ্বর... মানুষকে সব কষ্ট দিও, কিন্তু প্রিয় মানুষের ভাগাভাগি করা ভালোবাসা দিও না।" ... একদিন আমি তাকে বললাম, — "আমি যদি একদিন চলে যাই, তুমি কাঁদবে?" সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, — "এসব কথা বলো না। আমি তোমাকে ভালোবাসি।" আমি মৃদু হেসে বললাম, — "হয়তো ভালোবাসো... কিন্তু আমি আর তোমার একমাত্র মানুষ নই।" সে কোনো উত্তর দিতে পারেনি। কিছু নীরবতা হাজারটা কথার চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়। ... আজও আমি তাকে ভালোবাসি। হয়তো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভালোবাসব। কিন্তু আগের মতো বিশ্বাস করতে পারব না। কারণ ভাঙা কাঁচ জোড়া লাগানো যায়, কিন্তু ফাটলের দাগ কখনো মুছে যায় না। আমি তাকে অভিশাপ দিই না। শুধু প্রার্থনা করি— যেন কোনো মানুষকে এমন ভালোবাসার পরীক্ষা দিতে না হয়, যেখানে প্রিয় মানুষটা বলে, "আমি তোমাকেও ভালোবাসি... আবার অন্য কাউকেও।" কারণ এই কথাটাই একজন মানুষের বুকের ভেতর নীরবে হাজারবার মৃত্যু ঘটানোর জন্য যথেষ্ট। শেষ কথা— "বিশ্বাস ভেঙে গেলে সম্পর্ক অনেক সময় টিকে থাকে, সংসারও টিকে থাকে; কিন্তু যে মানুষটা ভেতর থেকে ভেঙে যায়, সে আর কোনোদিন আগের মানুষ হয়ে উঠতে পারে না। সে শুধু বেঁচে থাকে—হাসিমুখে, অথচ প্রতিদিন একটু একটু করে মরে।"

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাজার আগে রানী নয়

এক দেশে ছিল দুই নারী—একজনের নাম প্রজ্ঞা, আরেকজনের নাম অহংকার। দু’জনেই একই রকম সংসারে পা রেখেছিল। একই রকম উঠোন, একই রকম মানুষের ভিড়, একই রকম হাসি-কান্না। কিন্তু সময়ের সাথে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেল। প্রজ্ঞা বুঝেছিল, সংসার আসলে একটা রাজ্য। এ রাজ্যের রাজা শুধু একজন মানুষ নয়—এখানে শ্বশুরের সম্মান, শাশুড়ির মুখের হাসি, স্বামীর পরিশ্রম, ভাইবোনের সম্পর্ক—সব মিলেই রাজ্যের ভিত্তি। তাই সে নিজের হাতে সংসারের ভাঙা দেয়ালে রঙ করেছে, ক্লান্ত মানুষদের কপালে স্নেহের জল ছুঁইয়ে দিয়েছে, স্বামীর ছোট সাফল্যকেও মানুষের সামনে গর্ব করে বলেছে। লোকেরা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল— “কি সুন্দর পরিবার!” “কি ভদ্র ছেলে!” “কি সম্মানিত মানুষ!” আর সেই প্রশংসার আলো যখন পুরো পরিবারকে আলোকিত করল, তখন অজান্তেই প্রজ্ঞার মাথাতেও মুকুট উঠে এলো। কারণ মানুষ জানে— যে নারী একটি পরিবারকে সম্মানের আসনে বসাতে পারে, সে নিজেও সম্মানের যোগ্য। রাজ্য বড় হলে রানীর মর্যাদাও বড় হয়। অন্যদিকে অহংকার প্রতিদিন নিজের ঘরের মানুষদের ছোট করত। স্বামীর ব্যর্থতা নিয়ে মানুষের সামনে হাসত, শ্বশুরবাড়ির দোষ গল্পের মতো ছড়িয়ে বেড়াত, সম্পর্কের ক্ষতগুলোকে আড়াল না করে...

"পানোর্জেরনোর্জের মেষ"

ফরাসি সাহিত্যের একটা তাৎপর্যময় গল্প হলো Mouton de Panurge। দু মিনিট সময় নিয়ে গল্পটি পড়লে আশাকরি আমাদের চিন্তা কিছুটা শানিত হবে। ফরাসী ভদ্রলোক পানোর্জ নদী পার হতে নৌকার যাত্রী হয় । নদীটা বেশ স্রোতস্বীনি। একই নৌকায় যাত্রী হিসাবে ওঠে ডেনডুনো নামক এক মেষ ব্যবসায়ী। তার সাথে অসংখ্য মেষ। ডেনডুনো খুবই মুনাফা আর অর্থলোভী ব্যবসায়ী। মানবতাবোধ , মহত্ত্ব ইত্যাদি থেকে সে যোজন যোজন দূরে। তার জীবনের সমস্ত কিছু শুধু অর্থ আর মুনাফা দিয়ে ঠাসা। নৌকাটি যখন নদীর মাঝপথে ঠিক এমন সময় পানোর্জ এবং ডেনডুনোর মধ্যে বেশ বাকবিতন্ডা হয়। পানোর্জ প্রতিজ্ঞা করে সে মুনাফালোভী ডেনডুনোকে আজ একটা কঠিন শিক্ষা দিবে। পানোর্জ ডেনডুনোর কাছ থেকে বড় একটা মেষ বেশ উচ্চমূল্যে কিনে নেয়। মেষটিকে দেখেই মনে হচ্ছিলো এই মেষটিই মেষদলের দলপতি। অধিক মুনাফা পেয়ে ডেনডুনো খুবই খুশি। এরপর ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা। পানোর্জ মেষটির শিং ধরে শক্তভাবে টেনে নৌকার এক প্রান্তে নিয়ে যায় এবং মাঝ নদীতে ফেলে দেয়। দলপতি মেষকে অনুসরণ করতে গিয়ে অন্যান্য মেষগুলোও একের পর এক নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ডেনডুনো এটা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা। ঘটনার ...

সম্পর্ক ভাঙার আগে একবার ভাবুন…

সবাই সুখ খোঁজে, কিন্তু খুব কম মানুষ দায়িত্ব নিতে চায়। একটা সম্পর্ক হঠাৎ করে ভেঙে যায় না—ধীরে ধীরে ভাঙে। অবহেলা, না বলা কথা, আর অন্য কোথাও স্বস্তি খোঁজার অভ্যাস—এইগুলোই একসময় দূরত্ব তৈরি করে। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়— যে মানুষটা একসময় আপনার সবচেয়ে আপন ছিল, তাকে না বুঝে, না লড়েই ছেড়ে দেওয়া কি সত্যিই সমাধান? ভালোবাসা মানে শুধু ভালো লাগা না, ভালোবাসা মানে খারাপ সময়েও পাশে থাকার সিদ্ধান্ত। নতুন কারো কাছে শান্তি খোঁজার আগে, একবার ভেবে দেখুন—আপনি কি আপনার পুরোনো সম্পর্কটার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন? ভবে দেখুন বিপরিতের মানুষটা আপনার জন্য কি কিছুই করেনি?সে কি আপনার ভালোলাগা সবগুলোর মধ্য একটিও স্পর্শ করে নি?যদি না'ই হয় তাহলে আপনি কেনো এতোদিন তাকে সঙ্গ দিলেন? পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন? কারণ সম্পর্ক ভাঙা সহজ, কিন্তু একটা সত্যিকারের সম্পর্ক গড়ে তোলা—খুব কঠিন। চলুন, আমরা সাময়িক অনুভূতির চেয়ে স্থায়ী সম্পর্ককে মূল্য দিতে শিখি। বিশ্বাস ভাঙার আগে, একবার নিজের কাছেই প্রশ্ন করি— আমি কি সত্যিই আমার দায়িত্বটা পালন করেছি যেটা আমি তার কাছথেকে চাইছি?